আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক ফ্যাশন সপ্তাহে প্রথমবারের মতো উন্মোচিত হতে যাচ্ছে ভারতীয় ডিজাইনার সব্যসাচী মুখার্জির নতুন উচ্চমানের গয়নার সংগ্রহ। বিশ্ববিখ্যাত মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠেছে এই প্রকল্প। উন্মোচনের পর এই সংগ্রহ বিক্রির জন্য রাখা হবে নিউইয়র্কের ক্রিস্টোফার স্ট্রিটে অবস্থিত সব্যসাচীর প্রধান দোকানে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন শাখা এবং বাছাই করা বিশেষায়িত খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রেও পাওয়া যাবে এই গয়না।
এই সহযোগিতার পরিধি কেবল বর্তমান সংগ্রহেই সীমাবদ্ধ নয়। মেট-এর পাঁচ হাজার বছরের শিল্প ও সংস্কৃতির বিশাল ভাণ্ডার থেকে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত প্রকল্প হাতে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গয়নার পর অ্যাকসেসরিজ ও পোশাকের নতুন সংগ্রহও আসতে পারে এই ধারাবাহিকতায়।
সংগ্রহের অন্যতম চমকপ্রদ অংশ হলো একজোড়া সোনার কানের দুল। জেড ও টারকোয়েজে সাজানো এই গয়নার অনুপ্রেরণা এসেছে সপ্তদশ শতকের একটি ইসলামী মুদ্রা থেকে, যা আগ্রায় তৈরি হয়েছিল এবং তাতে ছিল রাশিচক্রের প্রতীক। কানের দুলের উল্টো পাশে উজ্জ্বল কাটের হীরায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সব্যসাচীর নিজস্ব সিগনেচার—রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। ফলে প্রাচীন মুদ্রা, ভারতীয় ইতিহাস ও ডিজাইনারের ব্যক্তিগত নান্দনিকতা একই গয়নায় এসে মিলেছে।
আরেকটি গলার হারে রয়েছে বাঘের থাবার মতো আকর্ষণীয় নকশা। টুরমালিন ও জেডের ক্যাবোশঁ এবং বাদামি হীরায় সজ্জিত এই গয়নার উৎস দ্বাদশ শতকের একটি ইতালীয় বা বাইজেন্টাইন হাড় ও হাতির দাঁতের খোদাই করা প্যানেল। টুরমালিন, গারনেট, জ্যাসপার, ল্যাপিস লাজুলি ও জেড দিয়ে তৈরি আরেকটি ঝোলানো হার যেন পাথরের রঙে লেখা একটি প্রাচীন গল্প। এর নকশার ভিত্তি উত্তর গ্রিস ও ডানিউব অঞ্চলের থ্রেসীয় একটি পরিবারের রোমান মার্বেল ভাস্কর্য।
কাফ সংগ্রহের অন্যতম আকর্ষণ একটি বিশেষ গয়না, যা ১৮ ও ২২ ক্যারেট সোনায় গঠিত। গারনেট ক্যাবোশঁ ও উজ্জ্বল কাটের বাদামি হীরায় সজ্জিত এই কাফের নকশার উৎস তৃতীয় শতকের একটি রোমান মার্বেল সারকোফেগাস, যেখানে একটি সিংহকে অ্যান্টিলোপ শিকার করতে দেখা যায়। আরেকটি কাফের অনুপ্রেরণাও এসেছে রোমান সাম্রাজ্যের শেষ দিকের একটি ভাস্কর্য থেকে; গারনেট ও টুরমালিনে সাজানো এই নকশায় প্রাচীন ভাস্কর্যের শক্তিশালী দৃশ্যভাষা পেয়েছে আধুনিক রূপ।
এই সংগ্রহের প্রথম অংশের অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের শিল্পভাবনা ও কৌশল থেকে। তবে তা শুধু বাইজেন্টাইনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রাচীন রোমান ভাস্কর্য, ইসলামী মুদ্রা, মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় রিলিফ এবং নানা প্রাচীন শিল্পকর্মের মোটিফ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে পুরো সংগ্রহ। সব্যসাচীর হাতে মেট-এর সংরক্ষিত নিদর্শনগুলো হুবহু গয়নায় পরিণত হয়নি। বরং প্রতিটি ঐতিহাসিক নিদর্শনের গল্প, আকৃতি ও প্রতীককে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে ভারতীয় জুয়েলারি তৈরির ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের মাধ্যমে। অর্থাৎ, এটি নিছক প্রাচীন শিল্পের অনুকরণ নয়; বরং হাজার বছরের ইতিহাসকে বর্তমান বিলাসবহুল গয়নার ধারার মাধ্যমে ফ্যাশনের নতুন এক পরিভাষা তৈরির প্রয়াস।
বাইজেন্টাইন শিল্পকে বেছে নেওয়ার পেছনে রয়েছে একটি বড় ভাবনা। চতুর্থ থেকে পঞ্চদশ শতকের বাইজেন্টাইন ছিল বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রাচীন মিশর, গ্রিস, রোম, পারস্য এবং ভারত হয়ে সিল্ক রুটের সঙ্গে যুক্ত দূরপ্রাচ্যের নানা সভ্যতার প্রভাব সেখানে মিলিত হয়েছিল। সব্যসাচীর কাছে এই সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানই সবচেয়ে আকর্ষণীয়। তাঁর নকশায় তাই ইতিহাস কোনো স্থির বিষয় নয়; বরং মানুষ, ধারণা, শিল্প ও কারুশিল্পের চলাচলের একটি দীর্ঘ গল্প।
এই পুরো সংগ্রহের প্রতিটি গয়না ভারতে সব্যসাচীর দক্ষ কারিগরদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বড় শিল্পসংগ্রহের ঐতিহাসিক নিদর্শন এবার নতুন জীবন পেয়েছে ভারতীয় কারুশিল্পের হাতে। সেপ্টেম্বরের নিউইয়র্ক ফ্যাশন সপ্তাহে যখন প্রথমবার এই গয়না দেখা যাবে, তখন তা কেবল একটি নতুন বিলাসবহুল সংগ্রহের আত্মপ্রকাশ হবে না। বরং পাঁচ হাজার বছরের শিল্প-ইতিহাস কীভাবে আধুনিক বিলাসিতার ভাষায় ফিরে আসতে পারে, তারও এক দৃষ্টিনন্দন উদাহরণ হয়ে উঠবে এই নতুন যাত্রা।




