যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের সরকারি হতাহতের হিসেবে সম্প্রতি ইরান যুদ্ধের মৃতের সংখ্যা থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে চার মার্কিন সেনাকে। তাদের স্থান দেয়া হয়েছে ‘ওভারসিজ অপারেশনস’ বা বিদেশি অভিযান নামের একেবারে নতুন একটি পৃথক বিভাগে। সেনা প্রশাসনের এই পদক্ষেপ দেশ-বিদেশে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে যখন ট্রাম্প প্রশাসন হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালুর প্রচেষ্টায় ইরানে বিমান হামলা জোরদার করছে, অথচ জনপ্রিয়তা হারানো এই যুদ্ধ কীভাবে গুটিয়ে আনা হবে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে না।

সেনা নিয়ন্ত্রণ বিভাগ ‘ডিফেন্স ক্যাজুয়ালটি অ্যানালাইসিস সিস্টেম’ (ডিসিএএস) একে যুদ্ধের মৃত ও আহতের নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে বারবার উল্লেখ করে আসা হলেও, গত সপ্তাহে তারা ইরান-সংক্রান্ত তালিকা থেকে নিহত চার সৈনিক এবং কয়েক ডজন আহতকে বাদ দেয়। রবিবার সাইটটিতে ‘ওভারসিজ অপারেশনস’ নামের ওই বিভাগ চালু করা হয়, যেখানে ওই চার সেনা সদস্যের নাম ও ২০৭ জন আহতের তালিকা দেয়া আছে। তবে, আহত সবাই ইরানের এই সংঘাতে জড়িত ছিল কিনা তা নিশ্চিত নয়। মধ্যেপ্রা অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা সেন্ট্রাল কমান্ড প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে পেন্টাগনের দিকে ইঙ্গিত করলেও, পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসতাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করেনি।

পেন্টাগনের মুখপাত্র জোয়েল ভালডেজ গত বৃহস্পতিবার অনলাইন সিস্টেমে হতাহতের তথ্য কমে যাওয়ার ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে যুদ্ধি এই দাবি করেন যে এটি বাড়তে থাকা মানুষের ক্ষতি গোপন করার কোনও প্রয়াস নয়, বরং ‘তথ্যের বিচ্যুতি’ ও ‘অস্থায়ী তথ্য বিভ্রাটের’ ফলাফল যা ‘খুব দ্রুত’ সমাধান হয়ে যাবে।

মঙ্গলবার পর্যন্ত যুদ্ধের সরকারি হিসাবে নিহত ১৮ ও আহত ৪৮২ জন দেখানো হয়েছিল। গত মাসে একটি অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষেরের পরও সংঘর্ষ পুনরায় শুরু হওয়ায় চার সেনা নিহত হয়েছেন বলে ওয়েবসাইটটি ইঙ্গিত দিচ্ছিল। তাদের মধ্যে তিনজন জর্ডানের একটি ঘাঁটিতে ১৭ জুলাই ইরানরি ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন হামলায় এবং অপর একজন ইরাকে একদিন পর ইরানি ড্রোন নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণে নিহত হয়। বিভ্রান্তি আরও বেড়ে যায় যখন জর্ডানে নিহত দুইজনের ব্যাপারে পেন্টাগন বলেই, তারা ইসলামিক স্টেট গ্রুপ মোকাবেলার অভিযানে সহায়তা করছিল, এবং অন্য দুইজনকে কেবল বিদেশি অভিযানে সমর্থন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যালে মঙ্গলবারের একটি পোস্টে বলেন, “ইরান সামরিক সংবাতে” ১৮ জনের প্রাণহানি হয়েছে। কিন্তু বুধবার নাগাদ পেন্টাগন সিস্টেমে ইরান যুদ্ধের মৃতের সংখ্যা ১৪ ও আহত ৪২০-তে নেমে আসে। সেদিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে মার্কিন এক কর্মকর্তা জানায়, বাস্তবে যুদ্ধে আহতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ৫০০ ছাড়িয়ে গেছে। পেন্টাগনের শীর্ষ মুখপাত্র শন প্যারেন ওই দিন সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করেন যে তথ্যের এই পতন একটি ‘অস্থায়ী ডাটা বিঘ্ন’ মাত্র।

উল্লিখিত নতুন ‘ওভারসিজ অপারেশনস’ বিভাগটিতে ৭ জুলাই থেকে হতাহতের হিসাব দেয়ার কথা বলা হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। প্রারম্ভিক লড়াইতে ১৪ সেনা মারা যায়। এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি হয় এবং জুনের মাঝামাঝি একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও সেটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ৭ জুলাই ইরান ওমানের উপকূলের কাছে জাহাজপথে চলাচলরত তিনটি বাণিজ্য জাহাজে হামনা করলে মার্কিন সেনারা জবাব দিতে বাধ্য হয়। ট্রাম্প দ্রুতই ঘোষণা দেন যে যুদ্ধবিরতি শেষ। তখন থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনের পথ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পাল্টা ধাওয়া চলছে। প্রায় দুই সপ্তাহ যুক্তরাষ্ট্র রাতে ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে এবং ইরান জবাবে আমেরিকার মিত্রবাহিনী থাকা প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালায়। তবে, মধ্যস্থতার জন্য কুটনীতিক প্রচেষ্টা জোরদার হওয়ার পর দুই রাত ধরে কোনো হামলা হয়নি।

পুনরায় দ্বন্দ্ব শুরুর পর থেকে পেন্টাগন সামরিক কৌশল ও হতাহতের তথ্য আগের চেয়েও কম জানাচ্ছে। মে মাসের শুরু থেকে পেন্টাগন এ যুদ্ধ নিয়ে কোনও সাংবাদিক সম্মেলনও করেনি এবং সেন্ট্রাল কমান্ডের কর্মকর্তারা প্রতিনিধিদের হতাহতের হালনাগাদ দেয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। ভালেজ ও পেরেনের মত পেন্টাগন কর্তারা জোর দিয়ে বলছেন যে ডিসিএএস ওয়েবর্সাইটই যুদ্ধে নিহত ও আহতের তথ্য স্বচ্ছতা দেয়ার সত্যতার প্রমাণ।