জনস্বাস্থ্য খাতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের অ্যালামনাই অ্যাওয়ার্ড পেলেন হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের পাঁচ সাবেক শিক্ষার্থী। তাঁদের তালিকায় রয়েছেন বাংলাদেশের কুদসিয়া হুদাও। তিনি পাবলিক হেলথ প্র্যাকটিস ক্যাটাগরিতে লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে প্রতি বছর অ্যালামনাই উইকেন্ডে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য এই সম্মাননা প্রদান করা হয়। আগামী ২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে এ বছরের অ্যালামনাই উইকেন্ড। পুরস্কার বিজয়ীদের তালিকায় থাকা কুদসিয়া হুদা বর্তমানে জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদর দপ্তরে দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, স্থিতিস্থাপকতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ১২ আগস্ট প্রথম আলোয় তাঁর জীবনী নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে ফুটে উঠেছিল তাঁর অসাধারণ পেশাগত যাত্রার কথা।

মানবিক বিপর্যয় ঘটে যেখানেই, সেখানেই ছুটে যান কুদসিয়া হুদা। কঙ্গো, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ইয়েমেন, ভারত কিংবা জর্ডান—সবখানেই তাঁর উপস্থিতি লক্ষণীয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স বিভাগের প্রধান হিসেবে তিনি কাজ করছেন। এর আগে ২০০৪ সালে ইরানের কেরমান প্রদেশে ভয়াবহ ভূমিকম্পে যখন ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারান এবং অসংখ্য ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়, তখন আশ্রয়শিবিরে আশ্রয় নেওয়া মানুষের পাশে দাঁড়াতে ছুটে যান তিনি। সেখানে এক চার বছরের মেয়ের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়, যিনি মাকে ফিরিয়ে আনার আবদার করেছিলেন। মেয়েটির বাবার কাছ থেকে জানতে পারেন, ভূমিকম্পের রাতে মেয়েকে বাবার কোলে দিয়ে মা ঘরে ফেলে আসা পুতুল আনতে গিয়েছিলেন, আর আর ফেরেননি। এই ঘটনা কুদসিয়ার মনকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।

ভূমিকম্পের বছরের পরই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যোগ দেন কুদসিয়া হুদা। এরপর ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের সুনামিতে সব হারানো নারী, আফগানিস্তানের যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করা চিকিৎসক যাঁর পরিবার বোমা হামলায় নিহত হয়েছিল, এমন অনেক মানুষের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছে। প্রতিটি ঘটনাই তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমা হয়েছে। মিসরে কর্মরত অবস্থায় ২০১১ সালে আরব বসন্তের সময় ওমানে অফিসের কাজে গিয়ে স্বামী-সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অবশেষে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে কায়রোতে ফিরে গিয়ে কারফিউয়ের মধ্যে কূটনৈতিক পরিচয়পত্র দেখিয়ে পরিবারের কাছে পৌঁছান। একপর্যায়ে গৃহবন্দী হয়ে জাতিসংঘের বিশেষ বিমানে মিসর ছাড়তে সক্ষম হন।

আফগানিস্তানে কাজ করার সময় প্রাচীরঘেরা সুরক্ষিত হোটেলটি ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে গেলে তাঁদের জন্য তা মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইরাকে কাজ করতে গিয়ে পার্শ্ববর্তী ভবনে বোমা হামলা থেকে স্রেফ কপালগুণে বেঁচে যান। এসব ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে কাজ করতে গিয়ে মানসিক চাপ মোকাবিলায় কুদসিয়া হুদা শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম ও নিয়মিত ধ্যানের আশ্রয় নেন। মন ভালো না থাকলে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলেন, আর স্বামীর সঙ্গে সবকিছু ভাগ করে নেন। সবচেয়ে বেশি প্রশান্তি পান লেখালেখিতে। দীপা ফিরোজ ছদ্মনামে তিনি বেশ কয়েকটি বই রচনা করেছেন। ছোটবেলায় শেখা গানের চর্চাও ধরে রেখেছেন তিনি।

প্রিয় পোশাক শাড়ির প্রতিও তাঁর অটুট ভালোবাসা। জেনেভার অফিসেও তিনি প্রতিদিন শাড়ি পরেন। বিপর্যয়ের খবর পেলে স্যুটকেসে অন্তত একটি শাড়ি রাখতে ভুলে যান না। ইস্টার্ন ইকোনমিক ফোরাম, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বা জলবায়ু সম্মেলনে তিনি বাঙালি পোশাকেই উপস্থিত হন। কাজের জায়গায় স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার গুরুত্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ইরানে কাজ করার সময় লম্বা পোশাক ও স্কার্ফ পরতে হয়েছে, আফ্রিকায় ইবোলা মোকাবিলায় জীবাণুরোধী পোশাক, আর ইয়েমেন, সিরিয়া, সোমালিয়ায় বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরতে হয়েছে। কাজ চালানোর মতো ফরাসি, আরবি ও ফারসি ভাষাও শিখেছেন তিনি।

ঢাকায় বেড়ে ওঠা কুদসিয়া হুদা ভিকারুননিসা নূন স্কুল থেকে এসএসসি এবং হলিক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় বিয়ে হয় তাঁর। চতুর্থ বর্ষে প্রথম সন্তানের মা হন। অনেকে তখন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, সন্তান নিয়ে তাঁর পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার হবে না। কিন্তু ১৯৯১ সালে এমবিবিএস পাস করে তিনি সেসব ভুল প্রমাণ করেন। স্বাস্থ্য ক্যাডারে বিসিএস দিয়ে পঞ্চগড়ে যোগ দিয়ে প্রান্তিক মানুষের সেবা করেন। পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচিতে যুক্ত হয়ে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য হার্ভার্ডে যান। সেখানে পড়ার সময় টাফট বিশ্ববিদ্যালয় ও ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির সমন্বিত একটি মাস্টার্স কোর্সে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পান। ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে বোস্টনে এসব কাজ সামাল দেওয়া কঠিন মনে হলেও তাঁর পরামর্শক রিচার্ড ক্যাশ উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন, সন্তানদের শক্তিতে বিশ্বাস রাখতে। তাঁর সেই কথাই আজও সত্য প্রমাণিত হয়েছে।

মা-বাবা, স্থপতি স্বামী ও দুই মেয়ের কাছ থেকে সব সময় অনুপ্রেরণা পান কুদসিয়া। দুই মেয়েই প্রতিষ্ঠিত—বড় মেয়ে বিশ্বব্যাংকের এনার্জি সেক্টরে কাজ করেন, আর ছোট মেয়ে বাবার মতো স্থাপত্য পেশায় আছেন। বৈশ্বিক সমাজে বাংলাদেশি নারী হিসেবে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে কুদসিয়া হুদা বলেন, প্রাকৃতিক বিপর্য�় নিয়ে কাজ করা একজন বাংলাদেশির চেয়ে ভালো আর কে বুঝতে পারে? বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, রাজনৈতিক অস্থিরতা—এসব মোকাবিলা করেই তো আমাদের বেড়ে ওঠা।