আফগানিস্তানে তালেবানের পুনরায় ক্ষমতায় আসার পাঁচ বছর পূর্ণ হলো ১৫ আগস্ট। গত পাঁচ বছরে তালেবানবিরোধী একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছে, যারা দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে সরকারি বাহিনীর ওপর হামলার দায় স্বীকার করে আসছে। তবে এই গোষ্ঠীগুলো নির্দিষ্ট কোনো একক নেতৃত্ব বা ফ্রন্টের অধীনে ঐক্যবদ্ধ নয়। সম্প্রতি ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সরব উপস্থিতি লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, সশস্ত্র ফ্রন্টের এই ক্রমবর্ধমান সংখ্যা কি বিরোধীদের প্রকৃত শক্তিশালী হওয়ার ইঙ্গিত, নাকি তাদের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও অনৈক্যের বহিঃপ্রকাশ?

বাদাখশান প্রদেশের জেবাক এলাকায় তালেবান ও আফগানিস্তান ফ্রিডম ফ্রন্টের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে, যা বর্তমানে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। জাতিসংঘের মতে, তালেবানবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় থাকলেও তারা এখন পর্যন্ত আফগানিস্তানের কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি এবং তালেবান শাসনের জন্য বড় কোনো চ্যালেঞ্জ তৈরি করার সক্ষমতাও তাদের নেই।

২০২১ সালে সাবেক সরকারের পতনের পর ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (এনআরএফ) নামের সংগঠনটি তালেবানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তৎকালীন সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর শত শত সদস্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কাবুলের উত্তরে পানশির উপত্যকায় জড়ো হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তালেবানের বড় অভিযানের মুখে পানশিরের পতন ঘটলে লড়াই মূলত বিচ্ছিন্ন সংঘাত ও সীমিত অভিযানে রূপ নেয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক করিম আমিনি আল-জাজিরাকে দেওয়া মতামতে জানান, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর সাবেক সরকারের রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিরা তালেবানকে চাপে ফেলতে সশস্ত্র ফ্রন্ট তৈরির চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু মাঠপর্যায়ে তারা প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেননি। তাঁর মতে, এসব গোষ্ঠীর বেশির ভাগই বিদেশের মাটিতে গঠিত, ফলে আফগানিস্তানের ভেতরে তারা কোনো শক্তিশালী সামাজিক ভিত্তি তৈরি করতে পারছে না। তিনি আরও বলেন, তালেবানের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতের এই পথ এমন এক আফগান সমাজের মুখোমুখি হচ্ছে, যারা কয়েক দশকের যুদ্ধে ক্লান্ত এবং সাধারণ মানুষ আর নতুন কোনো যুদ্ধের চক্রে জড়াতে প্রস্তুত নয়।

আমিনির মতে, চার দশকের যুদ্ধের পর আফগান সমাজে যে পরিবর্তন এসেছে তা অনেক বিরোধী শক্তি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা সশস্ত্র বিরোধিতাকে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তরাধিকার হিসেবে দেখছে, যা বিদেশ থেকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব, কিন্তু আফগান জনগণের অগ্রাধিকার ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে তারা গুরুত্ব দিচ্ছে না।

আরেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক আবদুল করিম খান বলেন, কোনো এলাকা কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন দখলে রাখা আসল পরীক্ষা নয়। আসল পরীক্ষা হলো সেটি ধরে রাখা, সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা, যোদ্ধার সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং তালেবানকে তাদের সামরিক অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য করা। আফগান সমাজ যুদ্ধ না চাওয়ায় এসব বিদ্রোহী গোষ্ঠী স্থায়ী উপস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় স্থানীয় পরিবেশ খুঁজে পাচ্ছে না। তাঁর ভাষায়, যে আন্দোলন আফগানিস্তানের বাস্তবতা ও জনগণের প্রয়োজন থেকে উঠে আসবে না, তাদের পক্ষে দেশের ভেতরে শক্ত অবস্থান তৈরি করা কঠিন।

সম্প্রতি বাদাখশানের জেবাক এলাকার লড়াই বিরোধীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। গত জুলাইয়ে ফ্রিডম ফ্রন্ট দাবি করে তারা ওই এলাকায় তালেবানের ওপর হামলা চালিয়ে কয়েকটি ছাউনি দখল করেছে এবং তাদের ক্ষয়ক্ষতি করেছে। তালেবান অবশ্য সেই হামলা প্রতিহত করার ও হামলাকারীদের কয়েকজনকে হত্যার দাবি করেছে। সেখানে বেশ কয়েক দিন ধরে লড়াই চলেছে, যা সশস্ত্র বিরোধীদের চিরাচরিত চোরাগোপ্তা হামলার তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন।

আবদুল করিম খানের মতে, জেবাকের লড়াই বিরোধীদের সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি বড় পরীক্ষা। তারা চোরাগোপ্তা হামলার বাইরে দীর্ঘ লড়াইয়ের দিকে যেতে পারছে কি না, এখান থেকে সেটা বোঝার বিষয় ছিল। তবে যতক্ষণ না দেশের অন্যান্য প্রান্তে একই ধরনের লড়াই দেখা যাচ্ছে, ততক্ষণ একে 'কৌশলগত পরিবর্তন' বলা যাবে না।

তালেবানবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর তালিকা বেশ দীর্ঘ। এনআরএফ ও ফ্রিডম ফ্রন্ট ছাড়াও হোমল্যান্ড আর্মি, ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস মুভমেন্ট, ইউনাইটেড ফ্রন্ট অব আফগানিস্তান, গ্রিন মুভমেন্ট, ন্যাশনাল ইনডিপেনডেন্স ফ্রন্ট, রিপাবলিকান ফ্রন্ট, পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট, ন্যাশনাল গার্ড মুভমেন্ট, ন্যাশনাল রেভোল্যুশনারি ফ্রন্ট অব আফগানিস্তান, ফ্রিডম অ্যান্ড ডেমোক্রেসি ফ্রন্ট ও ন্যাশনাল ফ্রন্ট অব লিবারেটরসহ নানা গোষ্ঠীর নাম শোনা যাচ্ছে। তবে কোনো গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করলেই যে তারা আক্রমণ করেছে এমনটা নিশ্চিত নয়। অনেক সময় একই হামলার দায় একাধিক গোষ্ঠী দাবি করছে, আবার কখনো বিদেশের মাটিতে থাকা গোষ্ঠীগুলো এমন হামলার দায় নিচ্ছে যা অন্য কেউ ঘটিয়েছে।

ডিজিটাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ নুরির মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন দ্বিতীয় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মাঠের লড়াইয়ের মতোই অনলাইনেও তাদের অস্তিত্ব প্রমাণের চেষ্টা করছে। তাঁর ভাষ্যমতে, হামলার দাবির সত্যতা যাচাই করতে ছবি, ভিডিও, হামলার স্থান ও স্থানীয় লোকজনের সাক্ষ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন, শুধু বিবৃতি কোনো প্রমাণ নয়।

তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহউল্লাহ মুজাহিদ এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, তাদের উপস্থিতি মূলত সাইবার জগতে, বাস্তবে নয়। পুরো আফগানিস্তান এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণে এবং কোনো অস্থিতিশীলতা তৈরির সক্ষমতা এই গোষ্ঠীগুলোর নেই। তিনি আরও বলেন, আফগান জনগণ শান্তি ও স্থিতিশীলতা চায়, তারা আর পুরোনো 'যুদ্ধবাজদের' ফিরে আসা সমর্থন করবে না। আগের অভিজ্ঞতা থেকে জনগণ নতুনভাবে সশস্ত্র সংঘাত প্রত্যাখ্যান করেছে।

বিশ্লেষক রফিউল্লাহ কাকারের মতে, বিরোধীদের জন্য বড় এলাকা দখল করা এখনই জরুরি নয়। তারা মূলত তালেবানের রসদ ও জনবল ক্ষয় করার কৌশল নিয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু এই ক্ষয় দিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন আসবে না, এর জন্য সামাজিক ভিত্তি ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। আফগানিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সমীকরণ এখন আগের চেয়ে ভিন্ন। বড় সামরিক সংঘাতের চেয়ে সশস্ত্র বিরোধীরা এখন ছোট ছোট দলের ওপর নির্ভর করছে, অন্যদিকে তালেবান চেষ্টা করছে যেকোনো বিদ্রোহ অঙ্কুরেই বিনাশ করতে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক খালিদ আহমদী বলেন, বিরোধীরা তাদের সক্ষমতা অনেক সময় বাড়িয়ে বলে, কিন্তু তালেবান-পরবর্তী আফগানিস্তান নিয়ে তাদের কোনো ঐক্যবদ্ধ পরিকল্পনা নেই। অন্যদিকে তালেবানের শক্ত নিয়ন্ত্রণ থাকলেও তাদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সংকট রয়েছে। বিরোধীদের সংখ্যা বৃদ্ধি মানেই নতুন গৃহযুদ্ধ নয়, তবে এটি প্রমাণ করে যে আগের সরকারের পতনের মাধ্যমে আফগানিস্তানে সংঘাতের অবসান ঘটেনি।