ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাত থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে নতুন কৌশলগত চিন্তাভাবনার প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি নতুন করে ইরানে হামলা চালানোর পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও ভয়াবহ অভিযানের হুমকি দিলেও তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরানোর কার্যকর ইঙ্গিত দিতে পারেননি। মধ্যপ্রাচ্যে ঐতিহাসিক শান্তির লক্ষ্যে ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া একটি সমঝোতা স্মারক বর্তমানে ব্যর্থতায় পর্যবসিত। ট্রাম্পের জন্য উপলব্ধ বিকল্পগুলোর মধ্যে স্থলযুদ্ধে সেনা পাঠানো বা হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া—দুই পথই তিক্ত অভিজ্ঞতায় রূপ নিয়েছে।

'ডিফেন্স প্রায়োরিটিস'-এর এশিয়া বিষয়ক পরিচালক লাইল গোল্ডস্টিন পরিস্থিতিকে এক গভীর উভয় সংকট হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, 'উপযুক্ত কোনো পথ খোলা নেই' কথাটি এখন গতানুগতিক বুলিতে পরিণত হয়েছে। এই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব এখন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যা স্থবির কূটনীতিকে সচল করতে বহিঃশক্তিগুলোকে চাপ দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালি যদি বেসামরিক জাহাজ চলাচলের জন্য অনুপযোগী হয়ে ওঠে, তাহলে বিশ্বজুড়ে তেলের মজুত সংকট এবং ডিজেল ও সারের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের দামে ভয়াবহ উল্লম্ফ ঘটবে। এছাড়া আগামী শীতে ইউরোপে তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সংকটের আশঙ্কাও জোরালো হচ্ছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর পর্যটন ও নিরাপদ প্রবাসস্বর্গ হিসেবে ভাবমূর্তি এই যুদ্ধে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপের নড়বড়ে সরকারগুলো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের গতিপথ নির্ধারণের ঝুঁকি তৈরি করেছে। নতুন এক জনমত জরিপে ইরান ও জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের নীতির প্রতি সমর্থন ৩০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। এটি নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বিপর্যয়ের ইঙ্গিত।

এ অবস্থায় একটি সম্ভাব্য সমঝোতার রূপরেখা আলোচিত হচ্ছে যেখানে হরমুজের ওপর ইরানের কার্যকর নিয়ন্ত্রণকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরাজয় হিসেবে সরাসরি স্বীকার করতে হবে না, অন্যদিকে ইরানও তাদের প্রধান অর্জনগুলো রক্ষা করেছে বলে প্রচার করতে পারবে। সংকট সমাধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে বহুজাতিক একটি সংস্থা গঠন, যেখানে ইরানসহ উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো যৌথভাবে বাণিজ্যিক রুট পরিচালনা করবে এবং তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে কাজ করবে। পরিহাসের বিষয়, বাতিল হয়ে যাওয়া সমঝোতা স্মারকেই ইরান ও ওমানকে আহ্বান করা হয়েছিল অন্য উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সাথে আলোচনা করে প্রণালির ভবিষ্যত প্রশাসনের রূপরেখা নির্ধারণের জন্য।

ইরান ও ওমানের মধ্যে উপপতিমন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে, যেখানে প্রণালি আবার খুললে কীভাবে নৌ চলাচল ব্যবস্থাপনা করা যাবে তা নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে সরাসরি ট্রানজিট ফি আরোপের বিরোধিতা করে ওমান এক ধরনের 'সামুদ্রিক পরিষেবা' বাবদ ফি নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। 'বোরসে অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশন' এর এক নিবন্ধে এ হরমুজ ফি-র ধারণা পর্যালোচনা করা হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য টোল আরোপ নয়, বরং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য অবদান রাখা। এই মডেল মালাক্কা প্রণালির আদলে হতে পারে। লেখকদের হিসাবে, রটারডাম বন্দরের মতো স্থায়িত্বশীলতার ফি আরোপ করলে প্রস্তাবিত কর্তৃপক্ষ বছরে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার আয় করতে পারে।

নিবন্ধের অন্যতম লেখক এসফান্দিয়ার বাতমাঙ্গেলিদজ মনে করেন, ইরান এ বিষয়ে নমনীয় হতে পারে। কারণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা তেল রপ্তানির সুযোগের মতো বড় কৌশলগত লক্ষ্য তাদের সামনে রয়েছে। এ সমঝোতার মাধ্যমে ইরান প্রমাণ করতে চাইবে তারা পরাজিত হয়নি। এই বহুজাতিক পরিকল্পনা উপসাগরীয় অঞ্চলের আত্মবিশ্বাসী ইরানের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও শান্তি সুসংহত করার প্রশ্নেও উত্তর দিতে পারে।

তবে ট্রাম্পের পুনরায় আক্রমণের পথ বেছে নেওয়ায় আপাতত কূটনৈতিক আলোচনার পথ রুদ্ধ। ইরানের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ব কর্মসূচির বিষয়টিও অমীমাংসিত থাকবে। কিন্তু গোল্ডস্টি মনে করেন, বিকল্পের তীব্র সংকটেই একটি সমঝোতা অনিবার্য হতে পারে, যদিও সেটি হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

ট্রাম্পের একের পর এক বাণিজ্যশুল্ক ও কটুমন্ত্রের কারণে ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি মিত্রদের সঙ্গে পরামর্শ না করে যুদ্ধ শুরু করে তাদের সহায়তা না পাওয়ায় তিরস্কার করেছেন। ফলে ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পকে সাহায্য করতে খুব একটা আগ্রহী নন। তারা মাইন অপসারণের মতো সামরিক প্রস্তাব দিলেও তা সকল যুদ্ধংদেহী তৎপরতা বন্ধ করার শর্তে। জার্মান মার্শাল ফান্ডের ইয়ান লেসা বলেন, একটি সুস্পষ্ট ও সর্বসম্মত কৌশলের অভাব রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল এখন অস্পষ্ট।

তেহরানের অবস্থান সম্পর্কে এসফান্দিয়ার জানান, ইরান ওমানের প্রস্তাব নাকচ না করলেও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে এখনই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে তারা দ্বিধান্বিত। যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের 'শিক্ষা' হওয়ার আগে ইরান হয়তো প্রণালি স্বাভাবিক হতে দেবে না। ওয়াশিংটন ও তেহরান যদি দ্রুত এই ধ্বংসাত্মক আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে না পারে, তাহলে অন্যান্য শক্তির পক্ষে হস্তক্ষেপ ছাড়া গতি থাকবে না।