রাজধানী ঢাকার শিশুমেলা, ধানমন্ডি ও আদাবর এলাকার ফুটপাতে জীবিকার তাগিদে দিন কাটানো কয়েকজন বিক্রেতার জীবন এখন টিকে থাকার এক নীরব লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও খেলনা বিক্রি থেকে শুরু করে ভ্যানে ভুনা খিচুড়ি বিক্রি— এসব কাজের আয় দিয়ে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছেন তাঁরা। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়, বাসাভাড়া ও খাদ্যমূল্যের চাপে নাভিশ্বাস উঠছে তাঁদের।
আদাবর থানার সুনিবিড় এলাকার বাসিন্দা ৩৮ বছর বয়সী পারভীন আক্তার শিশুমেলার ডিএনসিসি ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্কের সামনে ফুটপাতে ছোটখাটো পণ্য নিয়ে বসেন। চুড়ি, ক্লিপ, ব্যান্ড, সেফটিপিন, মেহেদি, টুথব্রাশ, গলার মালা, তামার আংটি, খোঁপার কাঁটা — এসব পণ্য বিক্রির আশায় সকাল থেকে বসে থাকলেও একদিনে তাঁর বিক্রি হয়েছিল মাত্র ৮০ টাকা। সকাল ১০টায় বাসা থেকে বেরিয়ে বিকেল চারটা পর্যন্ত না খেয়ে ছিলেন তিনি, কারণ খাবার কিনলে হাতে আর কোনো টাকা থাকবে না। পারভীন বলেন, ‘বাসাত্তে খাইয়া আইছি। আবার যাইয়া খাব। খাওনের টেকা জোটে নাই।’
আড়াই বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামী হারানোর পর পারভীনের ওপর চারজনের সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে। বর্তমানে শ্যামলীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিসে রান্নার কাজ করে মাসে ১০ হাজার টাকা বেতন পান। কিন্তু বাসাভাড়াই দিতে হয় সাড়ে ৭ হাজার টাকা। বাকি টাকায় ১৮ বছর বয়সী মেয়ে ও ১৪ বছর বয়সী ছেলের ভরণপোষণ প্রায় অসম্ভব। স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। পারভীনের ভাষায়, ‘তিনবেলা খাওন জোটাতেই দায়। পড়াশোনা করাব কেমনে।’ সংসারের আয় বাড়াতে প্রতিবেশীর কাছ থেকে ৭ হাজার টাকা ধার করে পণ্য কিনলেও ব্যবসায়িক অনভিজ্ঞতার কারণে বেশি দামে কেনা সেই পণ্য এখন কম দামেও বিক্রি করতে পারছেন না। গত দুই মাসে মাত্র ১ হাজার ৭০০ টাকার পণ্য বিক্রি করতে পেরেছেন তিনি। পারভীন বলেন, ‘ধার কইরা টাকা আনছিলাম। এখন চালানই ওঠাইতে পারতাছি না।’
গ্রামে ফিরে যাওয়ার পথও বন্ধ। স্বামীর রেখে যাওয়া একমাত্র ঘর শাশুড়ি ও ননদ দখল করে রেখেছেন, এবং সেখানে গেলে তাঁরা ঘরের মালিকানা নিজেদের দাবি করেন। ফলে পারভীনের পক্ষে গ্রামে ফিরে কোনো কাজ করে খাবার জোগাড় করাও সম্ভব নয়।
পারভীনের পাশেই শিশুমেলার ২ নম্বর ফটকের সামনে খেলনা বিক্রি করেন ২৮ বছর বয়সী রাজীব মিয়া। ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার বাসিন্দা রাজীব ৯ বছর ধরে এ পেশায় আছেন। তাঁর বিক্রির টেবিলে থাকে বেলুন, বাঁশি, চরকি, পুতুল, প্লাস্টিকের হাঁস-মুরগি ও হাওয়াই মিঠাই। তবে পাইকারি বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং ক্রেতারা বাড়তি দাম দিতে না চাওয়ায় এখন ব্যবসা আগের মতো নেই। রাজীব বলেন, ‘সব মালের দাম বাড়ছে। মানুষ বাড়তি দাম দিতে চায় না। অনেকে শুধু জিগাইয়া যায়।’ মাসে গড়ে প্রায় দুই হাজার টাকার খেলনা বিক্রি করলেও লাভ থাকে মাত্র ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। স্ত্রী ও এক সন্তান নিয়ে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে সাড়ে সাত হাজার টাকা ভাড়ার এক কক্ষের আধাপাকা ঘরে থাকেন রাজীব। সংসারের খরচ মেলাতে না পেরে বেশির ভাগ দিন আলুভর্তা আর ডাল দিয়েই চলতে হয়। গ্রামে থাকা বাবা-মা ও ছোট বোনের কাছে টাকা পাঠানোর দায়িত্ব থাকায় মাছ-মাংস কেনা খুব সীমিত। তিনি বলেন, ‘মাছ-মোরগ কিনতে গেলেই টাকা শেষ অয়। পোলাও এখন বড় অইছে। তার পেছনেও খরচ লাগে। সব খরচ দিয়া কুলায় না।’
ধানমন্ডির ১৫/এ নম্বর সড়কে একটি ভ্যানে ভুনা খিচুড়ি বিক্রি করেন রাজীব হাওলাদার। ডিমসহ এক প্লেট খিচুড়ির দাম ৫০ টাকা, ডিম ছাড়া ৩০ টাকা। পথচারী, দারোয়ান, কেয়ারটেকার, রিকশাচালক ও দিনমজুরেরা এখানে খেতে আসেন। ভ্যানটি নিজের নয়, অন্যের ভ্যানে দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরিতে কাজ করে মাসে প্রায় ১৮ হাজার টাকা আয় করেন রাজীব। কিন্তু স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের পাশে পাঁচ হাজার টাকা ভাড়ার এক কক্ষের আধাপাকা ঘরে থাকেন তিনি। ১০ বছর বয়সী মেয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে, ছেলের বয়স তিন বছর। ঘরভাড়া, বিদ্যুৎ বিল (৮০০-৯০০ টাকা) ও মেয়ের পড়াশোনার খরচ বাদ দিলে বাকি ১০ হাজার টাকায় চারজনের খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো প্রায় অসম্ভব। গ্রামের বাড়ি বরিশালের আগৈলঝাড়ায় থাকা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কাছেও প্রতি মাসে টাকা পাঠাতে হয়। রাজীব বলেন, ‘এক কেজি মাছ ভালো দেখে নিতে গেলেই ৫০০ টাকা লাগে। মাস শেষে খরচের টাকা মেলে না। বেশি খরচ করলে বাসাভাড়া দিতে পারি না।’ শেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, ‘এত খরচে টেকা দায়। হগল সময় মাইপা মাইপা চলন লাগে।’

