ঈদুল আজহায় মুক্তি পাওয়া ‘রইদ’ ছবিটি এখনো দেশ-বিদেশে চলছে। সম্প্রতি রাজশাহীতে যাওয়ার পথে নেপথ্য গল্প ও পরবর্তী কাজের পরিকল্পনা শেয়ার করেছেন পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন। তিনি জানান, ‘রইদ’ শুধু একটি প্রেমের গল্প নয়; বরং নারী-পুরুষের সম্পর্ক, ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ও সমাজ-রাজনীতির পুরোনো ধারণাগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি চেষ্টা। বিশেষ করে নারীর প্রতি পুরুষের আধিপত্যের ঐতিহ্যবাহী ধারণাকে ভিন্নভাবে দেখার প্রয়াস ছিল তাঁর।
শুটিংয়ের জন্য শিল্পী-কলাকুশলীদের নিয়ে মাসের পর মাস সিলেটের শাহ আরেফিন টিলায় অবস্থান করেন সুমন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সাধু ও পাগলির মতো চরিত্রগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তাদের জীবনযাত্রার মধ্যে ডুবে যাওয়া জরুরি। ‘হাওয়া’র টিমের বেশির ভাগ সদস্য এই ছবিতেও কাজ করেছেন, যা দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকার সংস্কৃতি তৈরি করেছে। সুমনের মতে, ছবি নির্মাণের পুরো যাত্রাই তাঁর কাছে সবচেয়ে আনন্দের — চিত্রনাট্য থেকে শুরু করে শুটিং পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত স্মৃতি হয়ে থাকে।
আট-নয় মাস ধরে তৈরি সেটে ৫০ হাজার গাছ লাগানো হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি দৃশ্যের প্রয়োজনে বাড়িটি পুড়িয়ে ফেলতে হয়। সুমন জানান, বাড়িটি কেবল একটি সেট ছিল না; বরং এটি তাঁদের কাছে বসবাসের জায়গা হয়ে উঠেছিল। সেখানে রান্না, খাওয়া, ঘুমানো ও আড্ডা দেওয়া হতো। বাড়ি পোড়ানোর আগের দিন পুরো ইউনিটে একটা থমথমে পরিবেশ ছিল। সবাই শেষ ছবি তুলেছিলেন। বিশেষ করে যারা প্রতিদিন গাছে পানি দিয়েছেন, তাদের আবেগ ছিল বেশি। সেদিন সত্যি সত্যি আগুন জ্বললে কেউ কেউ কেঁদে ফেলেন। সুমনের ভাষায়, দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা বাড়িটাকে কেউ সেট হিসেবে দেখেনি — এটি ছিল অসংখ্য স্মৃতির অংশ।
প্রকৃতি এখানে শুধু পটভূমি নয়, গল্পের একটি সক্রিয় চরিত্র। সুমন মনে করেন, মানুষ নিজেই প্রকৃতি, কিন্তু আমরা তা ভুলে গেছি। ‘রইদ’-এর সাধু ও পাগলি প্রকৃতির সন্তান — তাদের চারপাশের পিঁপড়া, গরু, মহিষ, ব্যাঙ, শিয়াল সবই তাদের জীবনযাপনের অংশ। আধুনিক সমাজ প্রকৃতির সংকেতকে অবিশ্বাস করলেও সুমন সেই পুরোনো বিশ্বাসকে ধরতে চেয়েছেন। তাল পড়ার মতো ঘটনা পাগলির ফিরে আসার সঙ্গে জড়িত হয়ে যায়, যা আধুনিক দৃষ্টিতে অদ্ভুত মনে হতে পারে।
‘হাওয়া’র সাফল্যকে চাপ হিসেবে না নিয়ে সাহস হিসেবে নিয়েছেন সুমন। তিনি বলেন, দর্শককে নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করার দায়িত্ব নির্মাতার। গল্পের সংকট প্রসঙ্গে তাঁর মত, আমাদের নিজস্ব গল্পের শক্তির ওপর বিশ্বাসের অভাবই সবচেয়ে বড় সমস্যা। তিনি ‘রূপবান’ ও ‘সারেং বৌ’-এর উদাহরণ দিয়ে বলেন, নিজস্ব গল্পই দর্শক-হৃদয় জয় করেছে। অনুকরণের প্রবণতাকে তিনি সবচেয়ে বড় সংকট মনে করেন।
বিভিন্ন নির্মাতা তাঁর চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করেছেন — সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, ঝাং ইমু, আসঘর ফরহাদি, নুরি বিলগে জিলান, কিম কি দুক, আলেহান্দ্রো গনসালেস ইনারিতু, ওং কার-ওয়াই, স্ট্যানলি কুবরিক, বং জুন হো প্রমুখ। তবে তিনি বলেন, প্রভাব আছে কি না তা বলা কঠিন; সব কিছুই তাঁর ছবিতে প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের সিনেমার শক্তি হিসেবে তিনি তারুণ্যকে চিহ্নিত করেন। নতুন নির্মাতাদের মধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগ্রহ ও কারিগরি দক্ষতা রয়েছে। দুর্বলতা হলো নিজেদের গল্প খুঁজে বের করার তাড়নার অভাব। তিনি মনে করেন, নিজস্ব চলচ্চিত্রভাষা তৈরি করতে পারলেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সফল হওয়া যাবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে সুমন জানান, তৃতীয় ও চতুর্থ ছবি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হতে পারে। মানুষের মনস্তত্ত্ব বারবার ফিরে আসবে, কিন্তু ঘরানা বদলাতে পারে — প্রেম, সম্পর্ক, রাজনীতি বা অ্যাকশনধর্মী কিছু। বর্তমানে দুটি গল্প নিয়ে কাজ চলছে, শিগগিরই চিত্রনাট্য শুরু হবে এবং পরের বছর শুটিংয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।



