রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরে দেশের আধুনিক ভাস্কর্যকলার অগ্রদূত নভেরা আহমেদের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে একটি বিশেষ প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনকক্ষে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে স্থান পেয়েছে তাঁর ২৯টি ভাস্কর্য, ১১টি চিত্রকর্ম ও ৪৩টি আলোকচিত্র। প্রদর্শনীটি চলবে আগামী ২১ জুলাই পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকবে।

প্রদর্শনী কক্ষের প্রবেশপথে দর্শনার্থীদের স্বাগত জানাচ্ছে একটি মা-সন্তানের ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি দেখতে মুগ্ধ হচ্ছিলেন মিরপুরের বাসিন্দা ক্বাবেদুল ইসলাম, তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে তানহা ইসলাম। পেশায় ব্যবসায়ী ক্বাবেদুল বলেন, নভেরার জীবনী ও শিল্পকর্ম সম্পর্কে প্রদর্শনীতে বিস্তারিত তথ্য থাকায় তাদের ভালো লেগেছে। অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানহা জানায়, নিয়মিত ভাস্কর্য বা চিত্রকলার দর্শক না হয়েও এই প্রদর্শনী তাদের কাছে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা এনে দিয়েছে।

নভেরা আহমেদের ভাস্কর্যের প্রধান উপজীব্য ছিল পারিবারিক সম্পর্ক। দেশে সহজলভ্য সিমেন্ট ও বালু ব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন আকারের ভাস্কর্য তৈরি করেছিলেন। কোথাও মায়ের কোলে সন্তান, কোথাও বা সন্তানের হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকা মা—এমন অসংখ্য ভাস্কর্যে ফুটে উঠেছে চিরন্তন মমতা, প্রীতি ও দায়িত্ববোধ। যদিও ভাস্কর্যগুলোতে নাক-মুখ-চোখের স্বাভাবিক গড়ন নেই, তবু দর্শকের সহজাত উপলব্ধি দিয়ে পারিবারিক বন্ধনের মাধুর্য অনুভব করতে পারেন।

এছাড়া প্রদর্শনীতে গরু নিয়ে কৃষক, আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা নারী, ধ্যানস্থ বুদ্ধমস্তক ও শামুকের মতো ভিন্নধর্মী ভাস্কর্যও রয়েছে। বেশিরভাগ ভাস্কর্যই সিমেন্ট-বালু দিয়ে তৈরি, কিছু ব্রোঞ্জের ছোট কাজও আছে। নভেরা সিমেন্টের ভাস্কর্যে কোথাও গোলাপি বা সাদা রং ব্যবহার করেছেন, কোথাও কালো, আবার কোথাও সিমেন্টের মূল ধূসর রং অপরিবর্তিত রেখেছেন।

ভাস্কর্যের পাশাপাশি তিনটি রিলিফ-চিত্রকর্মও স্থান পেয়েছে, যেগুলোতেও পরিবারের বন্ধন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এ ছাড়া ১১টি চিত্রকর্ম রয়েছে—যার মধ্যে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, চন্দ্রালোকিত আকাশ, শকুন, টিয়া পাখি ও ছাগলের চিত্র রয়েছে। এসব চিত্রকর্মে উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার করেছেন শিল্পী।

প্রদর্শনীর একপাশে বিশাল বোর্ডে নভেরার জীবনের কালক্রমিক ঘটনাপঞ্জি তুলে ধরা হয়েছে। অন্যপাশে লেখক ও গবেষক শিকোয়া নাজনীনের একটি লেখা প্রদর্শিত হচ্ছে, যাতে তিনি নভেরার শিল্পকর্মের বৈশিষ্ট্য ও আধুনিক ভাস্কর্যে তাঁর অবদান বিশ্লেষণ করেছেন।

প্রদর্শনী উপলক্ষে বুধবার বিকেলে ‘গ্যালারি ওয়াক: শিকোয়া নাজনীনের সাথে’ শীর্ষক একটি বিশেষ আয়োজন হয়। এতে শিকোয়া নাজনীন বলেন, ‘নভেরা কোনো ছকবাঁধা নিয়মে কাজ করেননি। তাঁর কাজের মধ্যে এক ধরনের নির্জনতা ও আধ্যাত্মিকতা রয়েছে। এই ভাস্কর্যগুলোর সামনে দিয়ে গেলে মনে হবে যেন তারাও দর্শকদের দেখতে পাচ্ছে—এ অভিজ্ঞতা বিস্ময়কর।’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সংস্কৃতিবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এ কে এম আবদুল্লাহ ও জাদুঘরের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি স্থপতি মেরিনা তাবাশ্যুম। সভাপতিত্ব করেন জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব। স্বাগত বক্তব্য দেন জাদুঘরের সচিব সাদেকুল ইসলাম।

জাতীয় জাদুঘরের নিজস্ব সংগ্রহে থাকা নভেরা আহমেদের শিল্পকর্ম নিয়েই এই প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ছাড়াই শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীতে ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম, আলোকচিত্র, ব্যক্তিগত স্মারক ও জীবনপঞ্জি—সব মিলিয়ে দর্শকের সামনে উন্মোচিত হয়েছে দেশের ভাস্কর্যের পথিকৃৎয়ের সৃজন জীবনের বিস্তারিত চিত্র।