বাংলাদেশের আর্থিক খাতে এক নজিরবিহীন সাফল্যের গল্প লিখেছে মোবাইল আর্থিক সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বিকাশ। প্রতিষ্ঠার ১৫ বছরের মাথায় প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক সংখ্যা এখন প্রায় ৮ কোটি, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। প্রতি সেকেন্ডে গড়ে ২৭৭ বার লেনদেন সম্পন্ন হয় বিকাশে, আর প্রতি মিনিটে ২ কোটির বেশি টাকা লেনদেন হয়। বিদায়ী অর্থবছরে নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৬৬১ কোটি টাকা। দেশের বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যাংকটির গ্রাহক সংখ্যা ৩ কোটির কিছু বেশি, আর সিম সংখ্যার নিরিখে গ্রামীণফোনের গ্রাহক ৮ কোটি ৬৩ লাখ হলেও সেখানে একাধিক সিম ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে। অন্যদিকে বিকাশের প্রতিটি গ্রাহক ইউনিক, কারণ একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে শুধু একটি হিসাব খোলা যায়। এই হিসাবে ইউনিক গ্রাহক সংখ্যার বিচারে গ্রামীণফোনকেও ছাড়িয়ে গেছে বিকাশ।

প্রতিষ্ঠানটির আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো হিসাব খুলতে কোনো মাশুল লাগে না। শুধু একটি স্মার্টফোন বা বাটন ফোন থাকলেই চলে। ফলে শহর হোক বা গ্রাম, ধনী হোক বা গরিব—সবাই বিকাশের গ্রাহক হতে পারছেন। দৈনন্দিন জীবনে নগদ টাকার বিকল্প এখন মোবাইল ফোন আর বিকাশ যেন এক হয়ে গেছে। ২০১১ সালে যাত্রা শুরুর সময় টাকা পাঠানোর জন্য কুরিয়ার বা ডাকঘরের উপর নির্ভর করতে হতো, তাতেও সময় লাগত কয়েক দিন। আর সরকারি বিল পরিশোধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হতো। সেই চিত্র এখন পুরোপুরি বদলে গেছে।

বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহকরা এখন ২০০টির বেশি সেবা পাচ্ছেন। অতি ক্ষুদ্রঋণ, সঞ্চয়, বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জ—সবই এক অ্যাপে। প্রতিষ্ঠানটির ক্ষুদ্রঋণ সেবা চালুর পর থেকে ৩৫ লাখ গ্রাহক প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন, দৈনিক গড়ে ১ লাখ মানুষ ঋণ পাচ্ছেন। এছাড়া ৭০ লাখ গ্রাহক ডিপিএস ও সঞ্চয় হিসাব খুলেছেন।

বিকাশের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল কাদীর জানান, দেশের যে কোনো প্রান্তের মানুষ বিকাশের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল লেনদেন করতে পারছেন, যা দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় এনেছে। তাঁর মতে, ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়তে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে বিকাশ।

উল্লেখ্য, ব্র্যাক ব্যাংক ও মার্কিন প্রতিষ্ঠান মানি ইন মোশনের যৌথ উদ্যোগে ২০১১ সালের ২১ জুলাই পথচলা শুরু হয় বিকাশের। প্রথম দিকে কর্মী ছিল মাত্র ৩৭ জন, সেবা ছিল মাত্র তিনটি—ক্যাশ-ইন, ক্যাশ-আউট ও সেন্ড মানি। এখন কর্মী সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়েছে, আর নিবন্ধিত গ্রাহক ৮ কোটি ৪০ লাখ। শুরুর দিকে লোকসানে থাকলেও বর্তমানে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষ ১০ মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠানের একটি বিকাশ।

দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার এজেন্ট ‘হিউম্যান এটিএম’ হিসেবে কাজ করছেন। তৈরি পোশাক শিল্পের ১ হাজার ৩০০ প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বিকাশের মাধ্যমে বেতন পাচ্ছেন, যাদের ৬০ শতাংশই নারী। সামাজিক নিরাপত্তার সরকারি ভাতাও বিতরণ করা হচ্ছে বিকাশের মাধ্যমেই।

বিকাশের মালিকানায় রয়েছে বিশ্বব্যাংকের আইএফসি, গেটস ফাউন্ডেশন, চীনের অ্যান্ট ইন্টারন্যাশনাল ও জাপানের সফটব্যাংকের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান। এরা মোট ৩৮ কোটি ১০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছে বিকাশে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনুসর মনে করেন, বিকাশ যেমন এগিয়েছে, আর্থিক সেবা খাতটি ততটা এগোয়নি। নগদ অর্থের ব্যবহার বাড়ছে। তাঁর ভাষ্য, বিকাশের মতো আরও চার-পাঁচটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো গেলে আরও ভালো হতো, কিন্তু নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতা ও পরিকল্পনার অভাবে তা সম্ভব হয়নি। তিনি আরও বলেন, বিকাশের এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো লেনদেনকে এজেন্টনির্ভর ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট থেকে সরিয়ে মার্চেন্ট অ্যাকুইজিশনের দিকে নিয়ে যাওয়া, যাতে নগদ লেনদেন কমে আসে।