যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার আড়াইশো বছর পূর্ণ হওয়ার এই মুহূর্তে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি চরম বিভক্তির শিকার। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট শিবিরের মধ্যে দূরত্ব শুধু নির্বাচনী লড়াইয়েই নয়, বরং শিক্ষা, অভিবাসন, নাগরিক অধিকার ও সংস্কৃতির মতো বিষয়েও প্রকট হয়ে উঠেছে। এমনকি স্বাধীনতা দিবসের মতো জাতীয় উৎসবও এখন দুই মেরুতে বিভক্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল এই বিভাজনকে আরও গভীর করছে। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে নিজেকে সমগ্র জাতির প্রেসিডেন্টের চেয়ে নিজের জোটের নেতা হিসেবেই বেশি উপস্থাপন করেছেন ট্রাম্প। তাঁর বিপক্ষে ভোট দেওয়া রাজ্য ও শহরগুলোর বিরুদ্ধে ফেডারেল ক্ষমতা প্রয়োগের নজিরবিহীন উদ্যোগ নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কখনো ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন, কখনো স্থানীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত, আবার কোথাও অর্থায়ন বন্ধের হুমকি দেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপ আদালতে বাধাগ্রস্ত হলেও রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে।
ইতিহাসবিদ ডগলাস ব্রিংকলে বলেছেন, ট্রাম্পের বিপক্ষে ভোট দেওয়া অঞ্চলগুলোর বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি সবচেয়ে জঘন্য হুমকি। তিনি আরও বলেন, একজন প্রেসিডেন্ট শুধু তাঁকে ভোট দেয়নি বলে রাজ্যগুলোকে শাস্তি দিচ্ছেন—এ ধারণা ভয়াবহ এবং এটি কর্তৃত্ববাদের সংজ্ঞার সঙ্গেই মিলে যায়। ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড স্কুল অব পাবলিক পলিসির সাবেক ডিন ডোনাল্ড কেটল মন্তব্য করেছেন, বর্তমান বিভাজনের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো দেশের সর্বোচ্চ নেতা ইচ্ছাকৃতভাবে এই বিভাজন আরও বাড়িয়ে তুলছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে রাজনৈতিক বিভক্তি নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই আঞ্চলিক, অর্থনৈতিক ও বর্ণগত টানাপোড়েন চলছে। তবে সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো গৃহযুদ্ধ। ১৮৪০ ও ১৮৫০-এর দশকে দাসপ্রথা নিয়ে উত্তর ও দক্ষিণের বিরোধ এতটাই তীব্র হয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। সেই সংঘাত রাজনীতি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলগুলোকে বিভক্ত করে দেয়। গৃহযুদ্ধের পর পুনর্গঠনকাল শেষে দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে জিম ক্রো বর্ণবৈষম্যমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। ইউনিভার্সিটি অব কানেটিকাটের ইতিহাসবিদ মনীষা সিনহা মনে করেন, ১৮৭৬ সালের স্বাধীনতার শতবর্ষও প্রকৃতপক্ষে জাতীয় পুনর্মিলনের উৎসব ছিল না, কারণ তখন দক্ষিণে কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার খর্ব করা হচ্ছিল।
বর্তমান সময়ের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি তুলনা চলে ১৯৬০-এর দশকের। সে সময় নাগরিক অধিকার আন্দোলন, ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ, বর্ণগত দাঙ্গা ও তিন বড় নেতার হত্যাকাণ্ড দেশকে দীর্ঘদিন অস্থির রাখে। ১৯৭০-এর দশকে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির কারণে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের পদত্যাগের ঘটনাও ঘটে। তবে ১৯৭৬ সালের দ্বিশতবার্ষিকী উদযাপনে অন্তত জাতীয় পুনর্মিলনের আহ্বান ছিল, যা বর্তমানে প্রায় অনুপস্থিত।
বর্তমান বিভাজনের মূল কারণ আদর্শগত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। অভিবাসন, এলজিবিটিকিউ অধিকার, গর্ভপাত, শিক্ষা, বৈচিত্র্যনীতি ও নাগরিক পরিচয়ের মতো প্রশ্নে দুই শিবিরের অবস্থান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিপরীতমুখী। অর্থনৈতিক নীতিতেও স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ, কর ও ফেডারেল সরকারের ভূমিকা নিয়ে তাদের মধ্যে বড় মতপার্থক্য রয়েছে। এই ব্যবধান লাল ও নীল রাজ্যের নীতিতেও স্পষ্ট।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কোরে ব্রেটস্নাইডার এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ট্রাম্পের রাজনীতিতে অতীতের কয়েকজন বিতর্কিত প্রেসিডেন্টের বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে দেখা যায়। তিনি জন অ্যাডামসের মতো বিরোধীদের অ-মার্কিন হিসেবে উপস্থাপন করেন, উড্রো উইলসনের মতো অভিবাসীবিরোধী ও বর্ণগত ক্ষোভ উসকে দেন এবং রিচার্ড নিক্সনের মতো প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখেন। মনীষা সিনহার মতে, যখন সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব ও বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করে, তখন তা কর্তৃত্ববাদী শাসনের লক্ষণ।
ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিহাসবিদ ডগলাস ব্রিংকলে মনে করেন, ২০২৬ ও ২০২৮ সালের নির্বাচন নির্ধারণ করবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। ভোটাররা যদি তাঁর রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে ইতিহাস তাঁকে ক্ষণস্থায়ী অধ্যায় হিসেবে দেখবে। আর যদি তাঁর রাজনৈতিক পদ্ধতি নতুন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।




