ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় ভয়াবহ এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে বিগত এক বছরে সাতটি পৃথক হত্যাকাণ্ড ঘটলেও জড়িতদের কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নিহতদের তালিকায় যেমন আছেন শিশু-কিশোর, তেমনি আছেন নারী ও বৃদ্ধরাও।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সাত খুনের মধ্যে ছয়টির তদন্তভার সরাইল থানার হাতে থাকলেও কোনো মামলারই তদন্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। অপর একটি ঘটনার তদন্ত পরিচালনা করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

গত বছরের ৬ জুলাই শাহবাজপুর ইউনিয়নের একটি মসজিদের দ্বিতীয় তলা থেকে পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রীর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। প্রবাসীর ওই সন্তানকে যৌন নির্যাতনের পর নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে বলে সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিদেশে অবস্থান করা শিশুটির বাবা মুঠোফোনে প্রথম আলোকে তার হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, “যাঁদের সন্দেহ করি, পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আমরা এখনো হয়রানির শিকার হচ্ছি।” এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক বেলাল উদ্দিন জানান, ৪০ জনের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত পাওয়া ২১টি ফলাফলের সঙ্গে মেল পাওয়া যায়নি।

একই ধারাবাহিকতায়, গত ১০ জুলাই সরাইল সদরের কুট্টাপাড়া গ্রামে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারায় কিশোর জিহাদ মিয়া (১৫)। অজ্ঞাতপরিচয়দের বিরুদ্ধে মামলা হলেও তার হত্যাকারী এখনও ধরা পড়েনি। গত ১০ জুন পানিশ্বর ইউনিয়নের বেড়বলা গ্রাম থেকে কুলসুম আক্তার (২৮) নামের এক গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার গলা ও বুকে আঘাতের চিহ্ন ছিল, এবং খুনের পর নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও মুঠোফোন লুট হয়ে যায়। কিন্তু এই হত্যার সাথে কারা জড়িত তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

গত ২৫ জুন শাহজাদাপুর ইউনিয়নের একটি খাল থেকে দুই দিন নিখোঁজ থাকার পর আবু সাইদ (৬০) নামের এক বৃদ্ধের গলাকাটা লাশ পাওয়া যায়। মামলা করা হলেও তার হত্যাকারীকে চিহ্নিত করা যায়নি। এছাড়া গত ১৮ মে অরুয়াইল ইউনিয়নের দেলুয়া থেকে আবেদ আলী (১৭) নামের এক কিশোরের গলাকাটা লাশ এবং গত ২৩ মার্চ কালীকচ্ছ ইউনিয়নের মনিরবাগে নৈশপ্রহরী নূর আহমদ (৭৩)-কেও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সর্বশেষ গত বছরের ৩০ জুলাই কালীকচ্ছ ইউনিয়নের দত্তপাড়া এলাকায় ব্যবসায়ী মোস্তফা কামালকে (৫৫) কুপিয়ে হত্যা করে তার টাকা লুট করা হয়।

সরাইল উপজেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সদস্য মৃধা আহমাদুল কামাল পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “পুলিশ প্রশাসনকে অধিক মনোযোগের সঙ্গে কাজ করতে হবে। একটি শিশু যৌন নির্যাতনের পর খুন হবে, এক বছর পরও খুনিরা শনাক্ত হবে না, তা কি মানা যায়?”

সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়া জানান, এই হত্যাকাণ্ডগুলোতে অধিকাংশ জড়িতই মাদকাসক্ত এবং বিভিন্ন অপতকর্মে লিপ্ত। তিনি দাবি করেন, কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে তবে তাদের কাছ থেকে তথ্য বের করা কঠিন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরও বলেছে যে তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।