হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের পথ নিয়ে প্রাথমিক সমঝোতার পর চূড়ান্ত চুক্তির দিকে এগোচ্ছে ইরান ও ওমান। কয়েক দিনের আলোচনার পর গত বুধবার রাতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ওমানের সঙ্গে প্রাথমিক ঐকমত্যের কথা জানান। তিনি আরও বলেন, মতভেদ থাকা বিষয়গুলো পর্যালোচনার পর শিগগিরই চুক্তি ঘোষণা করা হতে পারে। প্রাথমিক সমঝোতা অনুযায়ী, এই জলপথে প্রবেশ করা জাহাজগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও সেবা ফি নেওয়ার সুযোগ তেহরানের হাতে থাকবে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদির ভাষ্য অনুযায়ী, সমঝোতা অনুযায়ী পারস্য উপসাগরে জাহাজ প্রবেশ ও বের হওয়ার পথের নিয়ন্ত্রণ করবে তেহরান।

কিংস কলেজ লন্ডনের শিক্ষক রব জেইস্ট পিনফোল্ড খসড়া চুক্তি সম্পর্কে আরও কিছু ধারণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, সমঝোতা অনুযায়ী হরমুজে দুটি পথ থাকবে—একটি ইরানের উপকূল দিয়ে এবং অন্যটি ওমানের উপকূল দিয়ে। তবে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যুদ্ধের আগে হরমুজের মাঝবরাবর যে পথ ব্যবহার করা হতো, নতুন পথ দিয়ে সে পরিমাণ জাহাজ চলাচল সম্ভব নয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে নতুন পথ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, খসড়া চুক্তি অনুযায়ী হরমুজ দিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করা জাহাজগুলোর ওপর ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। তবে প্রধান অমীমাংসিত বিষয়গুলোর একটি হলো উপসাগর থেকে বেরিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোর ওপর ইরানের কী ধরনের ভূমিকা বা কর্তৃত্ব থাকবে। এই বিষয়ে পর্যালোচনা চলছে। হরমুজে জাহাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ কেমন হবে তার বিস্তারিত পথরেখা তৈরির কাজও চলছে বলে মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে।

সেবা ফি নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে কিছু মতবিরোধ রয়েছে। জাহাজে থাকা পণ্যের মোট মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ ফি নিতে চায় তেহরান। অন্যদিকে, ওমান এই সেবা ফি ৩ শতাংশ করতে আলোচনা করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের ফির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আল–জাজিরার সাংবাদিক তোহিদ আসাদি কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছেন, দু–একটি অমীমাংসিত বিষয় তেমন জটিল নয়, কারণ মূল বিষয়—অর্থাৎ হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলে দুই পক্ষ রাজি হয়েছে। সূত্রের মতে, বৃহস্পতিবার দিনের শেষ নাগাদ একটি চুক্তির ঘোষণা দিতে পারে তেহরান।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হলে তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি পরিবহন করা হতো। হরমুজ বন্ধ থাকায় জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে ওঠে, যা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে ওয়াশিংটনকে চাপে ফেলে। এমন পরিস্থিতিতে প্রণালিটি চালু করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত জুলাইয়ে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক হামলা চালালেও তেহরানকে পিছু হটাতে পারেনি ওয়াশিংটন। ইরান সরকার তাদের আগের অবস্থানেই অটল রয়েছে যে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল করলে তাদের নিয়ন্ত্রণ পথ দিয়েই করতে হবে এবং এর বিনিময়ে টোল নেবে তারা। ওমান উপকূল দিয়ে জাহাজ চলাচল করলে ইরান বাহিনী হামলাও চালাচ্ছিল। এই পরিস্থিতিতেই ইরান–ওমান আলোচনা শুরু হয়।

হরমুজে টোল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মূল মাথাব্যথা থাকলেও এ আলোচনায় দেশটিকে যুক্ত করা হয়নি বলে ইরান জানিয়েছে। সমঝোতার খবর সামনে আসার পর ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। তারা বলেছে, হরমুজে অস্থায়ী কোনো পথে জাহাজ চলাচলে অনুমতি বা টোল গ্রহণযোগ্য নয়। আল–জাজিরার সাংবাদিক মাহমুদ আবদেল ওয়াহেদ মন্তব্য করেছেন যে হরমুজ প্রণালি নিয়ে কোনো চুক্তি হলেও এটাই সংকটের শেষ নয়। এর কারণ হিসেবে তিনি হরমুজে টোল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চলমান নৌ অবরোধ এবং যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনার কোনো অগ্রগতি না হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া পাল্টাপাল্টি হুমকিও রয়েছে। বুধবার ট্রাম্প বলেছিলেন, চুক্তি না করলে ইরানে কঠোর হামলা চালানো হবে। আর বৃহস্পতিবার ইরানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির আকরামিনিয়া বলেছেন, যেকোনো হুমকির জবাব দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে ইরান।