দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলা পরিষদ চত্বরে প্রায় দুই দশক ধরে একটি পরিচিত দৃশ্য এখন রাজু আহমেদের হাঁক—‘লাগবে বাদাম, বুট?’ দৃষ্টিশক্তিহীন এই মানুষটি সাদা পাঞ্জাবি ও টুপি পরে, সাদা লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটেন। গলায় লোহার সরু রিং থেকে ঝুলতে থাকে ভাজা বাদাম, ছোলা আর চানাচুরের ছোট প্যাকেট। ক্রেতারা নিজেরাই পছন্দের প্যাকেট নেন এবং তার হাতে টাকা তুলে দেন।

পশ্চিম জয়দেবপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসরত রাজু আহমেদের বয়স ৩৮। সম্প্রীতি প্রথম আলোর মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, দীর্ঘ এই সময়ে কখনোই তার প্রতি কেউ অসাধু আচরণ করেনি। তাঁর ভাষায়, ‘আজ পর্যন্ত কেউ আমার বাদামের টাকা মেরে খায়নি। বরং ১০ টাকার বাদাম কিনে অনেকে ২০ টাকা দিয়ে যান।' মানুষের এই সততাই হয়ে উঠেছে তার ব্যবসায়ের মূল পুঁজি।

শৈশবে স্থানীয় এক হাফেজিয়া মাদ্রাসায় পড়লেও অভাবের জন্য বাবা তার লেখাপড়ার খরচ চালাতে না পারায় শিক্ষা জীবনের ইতি ঘটে। ভেঙে যায় হাফেজ হওয়ার স্বপ্ন। গ্রামের লোকজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় তাকে কোনো কাজে নিতেও চাইত না। সেই পরিস্থিতিতে ভিক্ষাবৃত্তিকে জীবনসঙ্গী না করে বাদাম বিক্রির কঠিন পথটিকেই বেছে নেন রাজু। যদিও শুরুতে অনেকেই নিরুৎসাহিত করেছিলেন এই ভেবে যে, চোখের অভাবে মানুষ পণ্য নিয়ে টাকা না দিয়েই সরে যাবে। কিন্তু সেই আশঙ্কা মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে বাদামের পাশাপাশি ছোলা ও চানাচুরও তার বিক্রির তালিকায় আছে, যা থেকে দৈনিক ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মতো লাভ হয়।

রাজু আহমেদের প্রতিদিনের রুটিনেও এক ধরণের নিষ্ঠার চিত্র ফুটে ওঠে। বিকেলে বি্ামপুর শহর থেকে কাঁচা বাদাম আর ছোলা কিনে বাড়ি ফেরেন তিনি। তারপর স্ত্রী সেগুলো ভেজে ছোট প্যাকেট বানিয়ে লোহার রিংয়ে সাজিয়ে রাখেন পরের দিনের বিক্রির জন্য। এই পরিশ্রমের মাধ্যমে চার সদস্যের পরিবারের ব্যয়ভার চলে যায়।

এলাকার অন্য অনেক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ভিন্ন পথ বেছে নিলেও, তিনি কেন ভিক্ষাবৃত্তিকে প্রত্যাখ্যান করলেন— এমন প্রশ্নে রাজুর জবাব, ‘ভিক্ষা করলে মানুষের কাছে হাত পাততে হয়। তার চেয়ে বাদাম বিক্রি অনেক সম্মানের। এতে সম্মানও থাকে, আবার কিছু আয়ও হয়।’ তার পরিবারের কেউ ভিক্ষায় জড়িত নয়, সকলেই পরিশ্রম করে, এই পরিচয়ই তাকে উজ্জীবিত রাখে। অন্য যারা দৃষ্টিশক্তিহীন, তাদের প্রতি তার সহজ পরামর্শ, ‘ভিক্ষা না করে যার যা সামর্থ্য আছে, তা দিয়েই হালালভাবে জীবিকা নির্বাহ করা উচিত। আমরা সব কাজ করতে পারব না, কিন্তু যে কাজ পারি, সেটাই করে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারি।’

তবে রাজুর জীবন আতিপাতি সমান গতিতে চলে না। বৃষ্টি, ঝড় বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপজেলা পরিষদ চত্বরে লোক সমাগম কম হলে তার বাদাম-বুটের বিক্রিও তলানিতে ঠেকে। এমন সংকটের দিনে তিনি স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দ্বারস্থ হন, এবং তারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাকে সহায়তা করে থাকেন।

বিরামপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. রোকনুজ্জামান রাজুকে একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে মর্যাদা দিয়ে বলেন, ‘রাজু অন্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ। যেদিন তাঁর বিক্রি কম হয়, সেদিন তিনি আমার অফিসে এলে ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করি। পাশাপাশি সরকারি যেসব সুবিধা তিনি পাওয়ার যোগ্য, সেগুলোও নিশ্চিত করার চেষ্টা করি।' এই সহযোগিতার হাত ভবিষ্যতেও প্রসারিত থাকবে বলেও তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।