বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অঙ্গনের পরিচিত মুখ শর্মিলী আহমেদ। সবাই তাঁকে ‘শর্মিলী মা’ নামেই চিনতেন। আজ ৮ জুলাই তাঁর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২২ সালের এই দিনে তিনি পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। শর্মিলী আহমেদের প্রকৃত নাম ছিল মাজেদা মল্লিক। ১৯৪৭ সালের ৮ মে তাঁর জন্ম।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তিনি ঢাকাই সিনেমার একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিতি পান। পরবর্তী সময়ে ছোট পর্দায় মা, দাদি কিংবা ভাবির চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের মনে গভীর জায়গা করে নেন। প্রায় চার দশকের বেশি সময় ধরে বিনোদনজগতে তাঁর বিচরণ ছিল। তবে অন্য অনেকের চেয়ে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম—একসঙ্গে অভিনয় ও সংসার দুটোই সামলেছেন।
পরিবারের প্রতি তাঁর দায়িত্ব ছিল অপরিসীম। সংসারের রান্নাবান্না, সবার খাওয়াদাওয়া—সব ঠিক করে তবেই শুটিং সেটে যেতেন তিনি। তাঁর কাছে পরিবার সব সময় আগে আসত, তারপর কাজ। এ কারণে পরিবারের সদস্যরা সব সময় তাঁকে অভিনয়ে সহযোগিতা করেছেন। বাস্তবেও তিনি মায়ের মতোই পুরো পরিবারকে আগলে রেখেছেন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে নিজেই এসব কথা বলেছেন শর্মিলী আহমেদ। প্রথম আলোর বিনোদন পাতায় সেসব প্রকাশিত হয়েছিল।
অভিনয় ও মা—দুই জায়গাতেই সফল ছিলেন তিনি। প্রথম দিকে পরিবারের প্রতি দায়িত্ব কম থাকলেও মা হওয়ার পর তা বেড়ে যায়। তখন অভিনয় কিছুটা কমিয়ে দেন। সিনেমা ও নাটকের বেশির ভাগ শুটিং তিনি ঢাকার মধ্যেই করতেন, যাতে সন্তানদের সময় দিতে পারেন। মেয়ে তনিমা আহমেদও অভিনয়শিল্পী। এক সাক্ষাৎকারে শর্মিলী আহমেদ বলেছিলেন, ‘মেয়ের জন্মের পর মা হিসেবে সব সময় তাঁকে সময় দিয়েছি। মানুষ করেছি। মা হিসেবে কতটা পেরেছি জানি না। আমাকে নিয়ে মেয়ের কোনো অভিযোগ আছে কি না, জানি না। থাকলে সে বলত, কারণ আমাদের সম্পর্কটা এমনই। এটুকু বলতে পারি, ব্যস্ততার জন্য মেয়েকে কম সময় দিইনি। একজন মা হয়েই সংসার করে গেছি।’
মেয়েকে সুশিক্ষায় বড় করতে হবে—এই চিন্তা সব সময় ছিল তাঁর। তাই শুটিংয়ে কখনো ঢাকার বাইরে যাননি। দূরে শুটিং থাকলে যত রাতই হোক বাসায় ফিরে আসতেন। যদি কখনো ফিরতে না পারতেন, তাহলে বোনকে বাসায় এনে রাখতেন মেয়েকে দেখাশোনার জন্য। তিনি বলতেন, ‘পরিবার, মেয়ে—সবার কথা চিন্তা করে কাজ কম করেছি। শুটিং শেষে বাসায় ফিরেই মা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি।’
শর্মিলী আহমেদের অভিনয় জীবন শুরু হয় মাত্র চার বছর বয়সে। রাজশাহী বেতারের শিল্পী ছিলেন তিনি। ষাটের দশকে চলচ্চিত্রাঙ্গনে নাম লেখান। তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘ঠিকানা’ (উর্দু ভাষায় নির্মিত) আলোর মুখ দেখেনি। তবে সুভাষ দত্তের ‘আলিঙ্গন’, ‘আয়না ও অবশিষ্ট’ এবং ‘আবির্ভাব’ চলচ্চিত্র দিয়ে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। স্বামী রকিবউদ্দিন আহমেদ পরিচালিত ‘পলাতক’ ছবিতেও অভিনয় করেছেন। স্বাধীনতার পর ‘রূপালী সৈকতে’, ‘আগুন’, ‘দহন’-এর মতো জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে দেখা যায় তাঁকে।
এ পর্যন্ত প্রায় ৪০০ নাটক ও ১৫০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। মঞ্চ, টিভি ও চলচ্চিত্রের বৈচিত্র্যপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করে সবার মন জয় করেছেন সাবলীল অভিনয় দিয়ে। অভিনয়জীবনে মায়ের চরিত্রে এত বেশি অভিনয় করেছেন যে বিনোদন অঙ্গনে তিনি সবার কাছে ‘মা’ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। মৃত্যুর মাস দুয়েক আগে তাঁর ক্যানসার ধরা পড়ে বলে জানিয়েছেন অভিনয়শিল্পী বোন ওয়াহিদা মল্লিক। এ নিয়ে তাঁর মধ্যে কিছুটা হতাশা কাজ করছিল। আজ তাঁর স্মৃতিচারণ করে নতুন প্রজন্মও জানতে পারে এই অসাধারণ শিল্পীকে।




