মেঘনা নদীর মাঝখানে গড়ে ওঠা বৈরাগীর চরটি যেন এক বিচ্ছিন্ন জনপদ। পাকা রাস্তা, বিদ্যুৎ বা স্থায়ী বসতির বদলে এখানে রয়েছে বিস্তীর্ণ সবুজ ঘাসের মাঠ, যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে শত শত মহিষ। ভোলার এই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বাথানভিত্তিক মহিষ পালনই এখানকার মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস। তবে দিনের আলো ফুরালেই এই চরে নেমে আসে আতঙ্ক; রাত মানেই মহিষ চুরির ভয়, যা এখন বাথানিদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। নদীর ভাঙন-গড়ন আর চুরির সঙ্গে লড়াই করেই এখানে টিকে আছে জীবনসংগ্রাম।
উত্তাল স্রোত আর ঢেউ পেরিয়ে গত ১ আগস্ট বৈরাগীর চরে গিয়ে দেখা যায় ৫৫ বছর বয়সী রাখাল নাগর হাওলাদারের সঙ্গে। রোদে পোড়া তার মুখ, চোখে ক্লান্তির ছাপ। মহিষের প্রসঙ্গ উঠতেই তার কণ্ঠে ভারী হয়ে আসে আক্ষেপ। গত কয়েক মাসের ব্যবধানে তার ১০টি মহিষ চুরি হয়ে গেছে। চার দশকের শ্রম-ঘামে গড়ে তোলা এই গবাদিপশুর বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় অর্ধকোটি টাকা। নিজের ৩০টি মহিষের বাথান পরিচালনার পাশাপাশি মাসে ১৫ হাজার টাকা বেতনে তিনি কাজ করেন কাশেম মাস্টারের বাথানে, যেখানে রয়েছে প্রায় ৬৫০টি মহিষ। সেই বাথান থেকেও বিভিন্ন সময় চুরি হয়েছে ৩৫টি মহিষ।
নাগর হাওলাদার বলেন, ‘এহোন আমার বোইষ ৩০টা, ৪০টা আছিল। চোরেরা নিতে নিতে এই জায়গাত্তেন ১০টা বোইষ লইয়া গেছে। আমরা হইলাম গরিব মানুষ, অসহায় মানুষ। দিন-রাইত কষ্ট করি, রোইদে পুরি, বিষ্টিত বিজি, জোয়ারে হাতরাই। এইভাবে বোইষ লালন-পালন কইরা কোনো রকম চলি, নিজে খাই, সংসার চালাই। আমার বোইষগুলা নিয়া গ্যাছে, অসহায় হোই গেছি।’ বাথানের জীবন যে কেবল মহিষ চরানো নয়, তা এই এলাকার মানুষের কাছে সুস্পষ্ট। প্রতিদিন প্রকৃতির সঙ্গে নিয়মিত লড়াই করতে হয় তাদের। রাতভর চরাঞ্চলের ঘাস খায় মহিষ, আর বাথানিরা পালা করে জেগে থেকে তাদের অবস্থান নজরে রাখেন। কোনো মহিষ দলছুট হলে সেটিকে ফিরিয়ে আনতে হয় কষ্ট করে। বর্ষা এলে উঁচু স্থানও পানিতে তলিয়ে যায়, তখন মহিষ পানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হয়। ভাটার সময় আবার মাঠে নেমে ঘাস খায়। প্রবল স্রোতে মহিষ ভেসে গেলে রাখালদের নদী সাঁতরে সেটিকে খুঁজে বের করতে হয়।
সারা রাত মহিষ চরানোর পর ভোরের আগেই স্ত্রী মহিষদের বাথানে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর শুরু হয় দুধ দোহনের প্রস্তুতি। ফজরের আজানের আগে বাথানিরা মহিষ এনে ঘরে বাঁধেন, একে একে নাম ধরে ডাকেন। ডাক শুনে বেরিয়ে আসে বাছুরগুলো, মা-মহিষের সঙ্গে দেখা হয়। দুধ দোহনের পর শুরু হয় মহিষের চিকিৎসার কাজ; ইনজেকশন দেওয়া, বড়ি খাওয়ানোসহ নানা দায়িত্বও পালন করতে হয় তাদের। আগে জোয়ার ও বন্যা নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকলেও এখন যোগ হয়েছে মহিষ চুরির আতঙ্ক। স্থানীয় মহিষমালিকদের ভাষ্য, আগে গরু-ছাগল চুরি হলেও মহিষ চুরির ঘটনা খুব একটা ঘটত না; এখন এই চুরিই তাদের প্রধান ভয়।
গত ৩১ জুলাই রাতে নাগর হাওলাদারের তিনটি মহিষ চুরি হয়েছে। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি জানান, ওই রাতে মোট ছয়টি মহিষ চুরি হয়। মহিষগুলো বাথানের আশপাশে বাঁধা ছিল, কিন্তু চোরের ভয়ে এখন রাতের অধিকাংশ সময়ই মহিষ বেঁধে রাখতে হয় তাঁদের। জোর দিয়ে বাঁধা অবস্থাতেই মহিষগুলো নিয়ে যাওয়া হয়েছে; কোনো শব্দ বা ট্রলারের আওয়াজও তাঁরা পাননি। নাগর আরও বলেন, আগে বাথানটি নদীর কাছে ছিল; এখন চোরের ভয়ে ভেতরে সরিয়ে এনেছেন। তবুও জোয়ারের সময় চোরেরা হানা দেয়।
মহিষমালিক শাজাহান মাস্টার, কাশেম মাস্টার, আবুল হাসান ও ফিরোজ ফরাজী দাবি করেন, গত দুই বছরে মেঘনা নদীর মধ্যে জেগে ওঠা বিভিন্ন চর থেকে তিন শতাধিক মহিষ চুরি হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রাতের অন্ধকারে সংঘবদ্ধ চক্র নিয়মিতভাবে এই চুরি চালিয়ে যাচ্ছে। এ বছরের ৩ আগস্ট মহিষমালিকেরা ভোলার পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ কাওছারের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তারা রাতের জোয়ারে বাথানে চোর-ডাকাতের হামলার অভিযোগ তোলেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার টহল বাড়ানো হলে উপদ্রব কমবে বলে মত প্রকাশ করেন তারা। পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট স্থানে চারণভূমি তৈরি করে দেওয়ার দাবিও জানান; তাদের মতে, সব মহিষ এক জায়গায় থাকলে চুরির ঘটনা কমবে।
বৈঠকে পুলিশ সুপার মহিষমালিকদের সমিতি গঠন, রাখালদের তথ্যভান্ডার তৈরি, তাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, লাঠি ও বাঁশি সরবরাহ এবং যেকোনো ঘটনায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করার পরামর্শ দেন। সরেজমিনে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি। তবে নাগর হাওলাদারের মতো রাখালদের কাছে এখন মূল প্রশ্ন হলো—চুরি হওয়া মহিষের ক্ষতিপূরণ কীভাবে মিলবে? আর মেঘনার চরে বাথানিদের নিরাপত্তা কবে নিশ্চিত হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।




