গত তিন দশকে কম খরচের বিপ্লব অর্থবাজারকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এখন প্রায় শূন্য খরচে মিউচুয়াল ফান্ড ও ইটিএফ-এ বিনিয়োগ করতে পারেন। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি পাবলিকলি ট্রেড কোম্পানি কিছু ক্লিকের মাধ্যমেই কর-দক্ষ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ ইটিএফ-এ কেনাবেচা সম্ভব। কিন্তু এই সহজলভ্যতা ও উচ্চ মূল্যায়নের কারণে খুচরা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক নতুন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ দেখা দিয়েছে। তারা সহজ ও কম ঝুঁকির ইটিএফ-এর বদলে উচ্চ অস্থিরতার শূন্য-যোগফল পণ্যের দিকে ঝুঁকছে, যাকে অর্থনৈতিক নিহিলিজম বলা হচ্ছে।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম এই নিহিলিজমকে সংজ্ঞায়িত করেছে ‘এক ধরণের ধারণা যেখানে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আর সতর্কতা বা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাকে পুরস্কৃত করে না’। ক্রিপ্টো বাজি, ভবিষ্যদ্বাণী বাজার ও ক্রেডিট কার্ডের ঋণ শোধ করতে অবসর তহবিল ভাঙার মতো ঘটনাগুলো জেন-জি-র এই আপাতদৃষ্টিতে আত্মঘাতী আর্থিক আচরণের উদাহরণ।

এই পরিস্থিতির জন্য ব্রোকারেজ হাউজগুলোও দায়ী বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ব্রড-মার্কেট মিউচুয়াল ফান্ড বা ইটিএফ-এ লাভ কম হওয়ায় তারা উচ্চ-মার্জিনের পণ্য বাজারে ছাড়ছে, যার অধিকাংশই ডেরিভেটিভস। এসব পণ্য খুচরা বিনিয়োগকারীদের জন্য কার্যত অকেজো, কিন্তু ইস্যুকারীদের জন্য লাভজনক। ২০২২ সালের দিকে সিবিওই বিপুল পরিমাণে জিরো-ডেট অপশন চালু করে। এতে বিনিয়োগকারীরা একদিনের জন্য কোনো সম্পদের দাম বাড়বে বা কমবে — এই বাজি ধরতে পারেন। খুচরা বিনিয়োগকারীরা প্রচুর ফি দিয়ে এই পণ্য কিনছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত লোকসানই হচ্ছে।

ঠিক কী কারণে এই নিহিলিজম তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বাজার রেকর্ড উচ্চতায় থাকলেও মিশিগান ভোক্তা আস্থা সূচক রেকর্ড নিম্নে রয়েছে। কে-আকৃতির অর্থনীতির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, যেখানে মধ্যবিত্তরা ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছে না। গত জুনে সিএফটিসি প্রথমবারের মতো মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য পারপেচুয়াল ফিউচার অনুমোদন দিয়েছে। এই ডেরিভেটিভের মেয়াদ শেষ হয় না এবং এটি সম্পূর্ণ শূন্য-যোগফল। সম্প্রতি ১০০ গুণ লিভারেজের বিটকয়েন পারপেচুয়াল ফিউচার খুচরা বিনিয়োগকারীরা বিপুল পরিমাণে কিনেছিল। বিটকয়েনের দাম পড়ায় তারা বিপুল অর্থ হারিয়েছে। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পারপেচুয়াল ফিউচারের দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। আরকিটেক্ট সিইও ব্রেট হ্যারিসনের মতে, এই বাজারের সিংহভাগই হেজিংয়ের পরিবর্তে ফটকাবাজির জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।

ভবিষ্যদ্বাণী বাজারও (প্রেডিকশন মার্কেট) একই পথে হাঁটছে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সময় কালশি প্ল্যাটফর্মে ২৭ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন হয়েছে এবং ৩০ লাখ নতুন ব্যবহারকারী যুক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অর্থ পজিটিভ-সাম ইক্যুইটি বাজারে বিনিয়োগ করা যেত। সবশেষে, খুচরা বিনিয়োগকারীদের অবসর অ্যাকাউন্টে অস্বচ্ছ প্রাইভেট ক্রেডিট ফান্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই তহবিলের অন্তর্নিহিত সম্পদের মূল্যায়ন সঠিক নয় এবং এতে প্রকৃত বৈচিত্র্যের সুবিধাও নেই, কিন্তু পরিচালকরা উচ্চ ফি আদায় করবেন।

দুই দশক আগে কল্পনা করাও কঠিন ছিল যে কেউ এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর মতো সূচকে বছরে প্রায় ১০ শতাংশ রিটার্ন পাবেন প্রায় শূন্য খরচে। এখন তা সম্ভব হলেও খুচরা বিনিয়োগকারীরা এই সুযোগ প্রত্যাখ্যান করছে। ফি বাদ দিয়ে শূন্য-যোগফল পণ্যে বিনিয়োগকারীদের নিট রিটার্ন ঋণাত্মক হতে পারে। এই অর্থনৈতিক নিহিলিজমই এক প্রজন্মের অবসরকালীন সঞ্চয়কে ধ্বংস করবে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা।