দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও খাদ্যপণ্যের বাজারে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান চড়া মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে ‘আনঅ্যাকাউন্টেড এক্সপেন্স’ বা অঘোষিত ব্যয় হ্রাসের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, কৃষকের কাছ থেকে ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানোর পথে যে অনিয়ম ও চাঁদাবাজি হয়, সেটিই দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে খাদ্যপণ্যের মূল্যশৃঙ্খল: বাজারব্যবস্থা, মুনাফার মার্জিন ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা’ শীর্ষক এক সংলাপে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, মূল্যস্ফীতি কমাতে তিনটি বিষয়ে নজর দিতে হবে: লজিস্টিক খরচ কমানো, ইনপুট খরচ কমানো এবং তৃতীয়ত, চাঁদাবাজি বন্ধ করা। তিনি ‘চাঁদাবাজি’ শব্দটির পরিবর্তে ‘আনঅ্যাকাউন্টেড ফর এক্সপেন্স’ পরিভাষা ব্যবহারের পরামর্শ দেন। মুক্তাদির উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের লজিস্টিক ব্যয় জিডিপির ১৬ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড় ১০ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি। এটিকে মূল্যস্ফীতির বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, বাজারে তথ্যপ্রবাহের সঠিক কাঠামো নেই, যা ‘মার্কেট অ্যাসিমেট্রি’ তৈরি করছে। উদাহরণ হিসেবে আলু উৎপাদনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, গত দুই বছর ধরে দেশে বার্ষিক ১ কোটি টনের বেশি আলু উৎপাদন হলেও কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদন ভোগের বাইরে থাকার পরও কেন কৃষকরা প্রতি বছর সমপরিমাণ আলু উৎপাদন করছেন—তা বোঝার জন্য যথাযথ তথ্যের অভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মূল্যশৃঙ্খলে স্বচ্ছতা আনার জন্য ‘ট্রেসেবিলিটি’ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। এর মাধ্যমে পণ্য কোথা থেকে এসেছে, কোথায় আছে এবং কীভাবে স্থানান্তরিত হয়েছে তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ফখরুদ্দিন আল কবির। তার গবেষণায় দেখা গেছে, কাঁচামরিচের দাম কৃষক থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে ১১৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। চালের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ, দেশি পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, মসুর ডালে ৭৮ শতাংশ, বেগুনে ৭২ শতাংশ এবং আলুতে ৫০ শতাংশ। ডিম, গরুর মাংস, রুই মাছ ও মুরগির দামও বিশ্লেষণে স্থান পেয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পঁচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে কৃষক পর্যায়ে দামের ওঠানামা বেশি হয়। তবে কৃষকদের আবহাওয়া, দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি আটকে থাকা, সংসার ও চিকিৎসা ব্যয়ের মতো চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় না নিলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না বলে কৃষি অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা মত দেন।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সহ-সভাপতি শোয়াইব চৌধুরী কৃষিপণ্যের দাম কমাতে রাতের যাত্রীবাহী ট্রেনে অতিরিক্ত বগি দিয়ে পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সাত্তার মণ্ডল, সাবেক অর্থসচিব সিদ্দিকুর রহমান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মাজিদ ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আক্তার লিমা।