বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও ‘আইকনিক’ ফুটবল ছবিগুলোর একটি—যেখানে ২০ বছর বয়সী এক লাজুক লিওনেল মেসি একটি প্লাস্টিকের বাথটাবে দাঁড়িয়ে আছেন এবং তার কোলে পাঁচ মাস বয়সী শিশু লামিনে ইয়ামাল। রোববার বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মুখোমুখি লড়াইয়ের আগে আবারও সামনে চলে এসেছে সেই ছবির স্মৃতি। কিন্তু কীভাবে জন্ম হয়েছিল এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের? ছবিটি মূলত ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে বার্সেলোনা ফাউন্ডেশন ও কাতালান দৈনিক দিয়ারিও স্পোর্তের যৌথ উদ্যোগে একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের অংশ হিসেবে তোলা হয়েছিল। ওই ক্যালেন্ডারে প্রতি মাসের প্রতীক হিসেবে ক্লাবের একেকজন ফুটবলারের সঙ্গে একেকটি শিশুকে জুটি বাঁধিয়ে ছবি তোলা হতো এবং বিক্রি থেকে প্রাপ্ত আয় চলে যেত ইউনিসেফসহ বিভিন্ন দাতব্য সংস্থায়।
সেই ছবির আলোকচিত্রী হুয়ান মনফোর্ত পরে স্মৃতিচারণ করে জানান, কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। তার ভাষায়, ‘এটি খুব কঠিন একটি ছবি ছিল। বলতে পারেন, ছবিটি তুলতে আমার রক্ত-ঘাম এক হয়ে গিয়েছিল।’ তখনকার মেসি বিশ্বসেরা নন, লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতলেও রোনালদিনিও, স্যামুয়েল ইতো, জাভি, অঁরির মতো তারকাদের ভিড়ে তিনি ছিলেন এক উদীয়মান প্রতিভা। ক্লাবের মূল দলে তার চতুর্থ বছর চলছিল এবং তিনি স্বভাবগতভাবেই বেশ লাজুক ছিলেন।
মনফোর্ত বর্ণনা করেন, হঠাৎ করে মেসিকে একটি ক্ষুদ্র শিশুর সাথে পানিভর্তি বাথটাবে দাঁড় করানো হলে শুরুতে কারও সাথেই কোনো যোগাযোগ হচ্ছিল না। পুরো পরিস্থিতি সবার জন্য একটু অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সব স্বাভাবিক হয় এবং শেষ পর্যন্ত একটি অসাধারণ ছবি পাওয়া যায়। ফুটবলাররা সাধারণত দ্রুত কাজ শেষ করতে চাইলেও এমন একটি অন্তরঙ্গ মুহূর্ত ফুটিয়ে তুলতে সময় দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন ইয়ামালের মা শেইলা এবানা। মনফোর্ত জানান, মা পাশে না থাকলে শিশুটি নিশ্চিতভাবেই অস্বস্তি বোধ করত। তারা চেয়েছিলেন ছবিটি কোমল ও আন্তরিক হোক, এবং ইয়ামালের মা অসাধারণ সহযোগিতা করেছিলেন।
ইয়ামালের পরিবার তখন বার্সেলোনা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে মাতারো শহরে বসবাস করত। ছোট্ট শিশুকে নিয়ে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে ক্যাম্প ন্যুতে আসা ও খেলোয়াড়ের জন্য অপেক্ষা করা ছিল যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। সেই পুরো দায়িত্বটাই একা সামলেছিলেন ইয়ামালের মা। পরবর্তীতে মনফোর্ত প্রতিটি পরিবারের মতো ইয়ামালের পরিবারকেও ছবির একটি কপি উপহার দিয়েছিলেন।
প্রায় সাত বছর পর সেই মাতারো শহর থেকেই নিয়মিত ক্যাম্প ন্যুতে যাতায়াত শুরু করে ইয়ামাল এবং ২০১৪ সালে যোগ দেয় বার্সেলোনার লা মাসিয়া একাডেমিতে। এরপর রূপকথার মতো তার উত্থান—২০২৩ সালে ১৫ বছর বয়সে লা লিগায় অভিষেক, একই বছর ১৬ বছর বয়সে স্পেন জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলা, ২০২৪ ইউরো জয় এবং এখন স্পেন ফুটবলের সবচেয়ে বড় আশার নাম। ২০২৪ ইউরোর সময় ইয়ামালের বাবা মৌনির নাসরাউই ছবিটি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করলে তা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
মনফোর্ত নিজেও বিস্মিত হয়েছিলেন যখন দিয়ারিও স্পোর্তের এক সাবেক সহকর্মী ফোন করে জানতে চান ছবিটি তারই তোলা কিনা এবং শিশুটির পরিচয় জানান। ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী হিসেবে এখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মাধ্যমে কাজ করা মনফোর্ত বলেন, হাজারো ছবির মধ্যে এটিই তার জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ হয়ে উঠেছে। তিনি এই ঘটনার সম্ভাবনাকে ‘লটারিতে জেতার মতোই ক্ষীণ’ বলে অভিহিত করেন এবং ভবিষ্যতে ইয়ামাল যত এগোবে ছবিটি তত বেশি ঐতিহাসিক হয়ে উঠবে বলে মন্তব্য করেন।
মনফোর্ত আরেকটি বিখ্যাত মুহূর্তের সঙ্গে এর তুলনা টানেন—১৯৮৬ সালে তোলা একটি ছবি যেখানে বার্সেলোনার তৎকালীন বল বয় পেপ গার্দিওলা করতালি দিচ্ছিলেন কোচ টেরি ভেনাবলসকে। তবে মেসি-ইয়ামালের ছবিটি এখন সমসাময়িক অনেক ছবিকে ছাড়িয়ে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় দলিলে পরিণত হয়েছে। বাথটাবের সেই পাঁচ মাসের শিশুটি এখন বিশ্বকাপ ট্রফির লড়াইয়ে সরাসরি মেসির মুখোমুখি হতে চলেছে।

