২০২৬ সালে গোয়েন্দা ও রহস্য-কাহিনি রচয়িতা রোমেনা আফাজের জন্মশতবর্ষ পালিত হচ্ছে। জনপ্রিয় ধারার এই লেখক ছিলেন একজন নারী, যিনি বগুড়ার মতো মফস্বল শহরে জীবন কাটিয়েছেন। মধ্যবিত্ত পরিবারের কন্যা তিনি, বাল্যকালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ থাকলেও তা অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়নি, তবে বিয়ের পর ১৯৪৩ সালে আজিজুল হক কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। দুই কন্যা ও সাত পুত্রের জননী হয়ে তিনি জলেশ্বরীতলার বাড়িতেই সারাজীবন কাটান।
রোমেনা আফাজের প্রথম গ্রন্থ ‘রক্তে আঁকা ম্যাপ’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৯ সালে। তিনি নিজের নামের সঙ্গে স্বামী আফাজউল্লাহ সরকারের নামের প্রথমাংশ যুক্ত করে রোমেনা আফাজ নামে পরিচিত হন। দস্যুরানী সিরিজ হিসেবে পরিকল্পিত হলেও এটি তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি, মাত্র ১২ খণ্ডে সমাপ্ত হয়। এরপর ১৯৬৫ সালে তিনি দস্যু বনহুর সিরিজের প্রথম খণ্ড প্রকাশ করেন, যা বিপুল পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত মোট ১৩৮টি খণ্ড প্রকাশের পর ‘দস্যু বনহুরের শেষ যাত্রা’ গ্রন্থের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সিরিজের ইতি টানেন।
বনহুরের আবির্ভাব সামন্তবাদী পটভূমিকায়, যেখানে অত্যাচারী ভূস্বামী বা ধনিকের বিরুদ্ধে নির্ধন মানুষের পক্ষে দস্যুতা চলে। সমাজ বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে রোমেনা আফাজের নায়কের বিচরণক্ষেত্রও রূপান্তরিত হয়। ফর্মুলা ধরে এগোয় বনহুরের কাহিনি—সর্ববিদ্যায় পারদর্শিতা, সাজ বদলে অসাধারণ দক্ষতা ও অস্ত্রচালনা। পরবর্তী পর্যায়ে সুন্দরী নারীদের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। বাংলা গোয়েন্দা কাহিনিতে এমন সাফল্য তুলনীয় হতে পারে কাজী আনোয়ার হোসেনের মাসুদ রানা সিরিজের সঙ্গে, তবে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য বিস্তর। রোমেনা আফাজের বই প্রকাশের জন্য তিনি নিজস্ব প্রকাশনা সংস্থা সাহিত্য কুটির গঠন করেছিলেন, যা সেবা প্রকাশনীর মতো মূলধারার প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ভিন্ন ছিল।
সাহিত্যবিচারের প্রচলিত মাপকাঠিতে রোমেনা আফাজের মূল্যায়নে সমস্যা রয়েছে। তাঁর রচনার ভাষাশৈলী, ব্যাকরণগত ত্রুটি ও বানানবিভ্রাট দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত। তবে কনটেন্টের বিচারে তাঁর কাহিনির বৈচিত্র্য ও বিবর্তন উল্লেখযোগ্য। পাকিস্তানি বন্দিশিবিরে আটক বাঙালিদের শ্রমদাস হিসেবে জাহাজে চালান করার ঘটনা তিনি তাঁর গল্পে তুলে ধরেছেন। ছদ্মবেশী বনহুর জাহাজের গতিপথ পাল্টে জুনাগড় বন্দরে নিয়ে যায় এবং সাগাইসহ বিভিন্ন শিবির থেকে বাঙালি নারীদের মুক্ত করে। এমন কাহিনি রচনা করেছেন একজন নারী, যিনি কখনো পাকিস্তানে পা রাখেননি, বগুড়া ছেড়ে ঢাকাতেও বিশেষ আসেননি।
রোমেনা আফাজের লেখায় ধর্মীয় গোঁড়ামি ও বিভাজন পেরিয়ে সৌহার্দ্যপ্রীতি ফুটে ওঠে। দস্যুরানী সিরিজের ‘খুনির সাধনা’ খণ্ডে গোয়েন্দা মিস্টার আহাদের বাল্যবন্ধু শঙ্করের বাড়িতে হিন্দু পরিবারের সাংস্কৃতিক আবহ এবং মুসলিম যুবকের অনায়াস অবস্থান দেখানো হয়েছে। নৌকায় যমুনা পাড়ি দিয়ে কাকাবাবু অখিল রায়ের গৃহে পৌঁছানোর দৃশ্যে ধর্মীয় গোঁড়ামি এড়ানোর জন্য আহাদকে এক দিনের জন্য হিন্দু সাজতে বলা হয়। এই উদার ধর্মনিরপেক্ষ মানসিকতা রোমেনা আফাজ বরাবর বহন করেছিলেন।
সার্বিক বিবেচনায় রোমেনা আফাজ বাংলা সাহিত্যের ভিন্ন স্বর—একজন প্রান্তবর্তী নারী যিনি নিজস্ব কণ্ঠস্বর ধারণ করেছেন। তাঁর টেক্সট ও টেক্সটের ভেতর-বাহির বিশ্লেষণ প্রয়োজন। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের ডিকনস্ট্রাকশন তত্ত্বের আলোয় তাঁর সাহিত্যকর্মের পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। জন্মশতবর্ষে তাঁকে অভিবাদন জানানো সময়ের দাবি, কারণ তাঁকে উপেক্ষা করা বাংলা সাহিত্যের জন্যই ক্ষতিকর।




