যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে ১৯৭০ সালের ২৬ জুলাই দিনটি ছিল মেঘলা ও বৃষ্টিময়। সিকস স্টেডিয়ামে বেসবল মাঠটি কাদা ও পানিতে পরিণত হয়েছিল, যেখানে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছিল রক ইতিহাসের এক স্মরণীয় কনসার্ট। জিমি হেনড্রিক্সের এই পরিবেশনাই ছিল তাঁর জীবনের শেষ পূর্ণাঙ্গ মঞ্চায়ন। স্টেডিয়ামটি সংগীতানুষ্ঠানের জন্য উপযুক্ত ছিল না, তবু টিকিট বিক্রি হয়ে যায় দ্রুত। দিনের জন্য রাখা কিছু টিকিটের আশায় ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন দর্শকেরা, বৃষ্টি উপেক্ষা করে কেউ সরে যাননি।

কনসার্টের আয়োজক টম হিউলেট জানান, সিয়াটল তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার ছিল এবং জিমি এই চ্যালেঞ্জ নিতে রাজি ছিলেন। বিমানে আসার পথে হিউলেট আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানালে জিমি শুধু ‘না’ বলে অনুষ্ঠান বাতিলের প্রস্তাব নাকচ করে দেন। দুপুর তিনটায় দর্শকদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া হয়, কিন্তু বৃষ্টি থামেনি। ১৪ বছর বয়সী দর্শক শেলি জারমো স্মরণ করেন, তাঁর কাছে শুধু একটি হুডযুক্ত সোয়েটশার্ট ছিল, কিন্তু জিমির জন্য অপেক্ষা করাই ছিল সবার একমাত্র লক্ষ্য।

প্রথমে মঞ্চে ওঠে রুব টিউবেন অ্যান্ড দ্য রোন্ডোনাস, এরপর ক্যাকটাস। টিম বোগার্ট ও কারমাইন অ্যাপিসের নেতৃত্বাধীন এই ব্যান্ডের প্রথম অ্যালবাম তখনই সেরা ২০০-এ জায়গা করে নিয়েছিল। এরপর পরিবেশন করে ক্যাট মাদার অ্যান্ড দ্য অল নাইট নিউজবয়েজ। সব ব্যান্ড ভালো সাড়া পেলেও দর্শকদের নজর ছিল এক জায়গায়—কখন মঞ্চে আসবেন জিমি হেনড্রিক্স।

জিমি পরিবারসহ স্টেডিয়ামে আসেন তাঁর মালিবু গাড়িতে। গেটে নিরাপত্তারক্ষী জানান, সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। জিমি হেসে বলেন, ‘আমি জানি। সে কারণেই তো এখানে এসেছি। আমাদের ঢুকতে দিন, না হলে অনেক মানুষ হতাশ হবে।’ পেছনের গাড়িগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও বলেন, ‘এরা আমার পরিবার। হলুদ ফক্সভাগেন পর্যন্ত সবাইকে ঢুকতে দিন।’

সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে উপস্থাপক জানান, আর কয়েক মিনিটের মধ্যে জিমি আসবেন। কিন্তু সেই কয়েক মিনিট এক ঘণ্টায় পরিণত হয়। শেলি জারমো বলেন, ‘আমরা সবাই সামনের দিকে চলে আসি এবং এক ঘণ্টা সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকি।’ শেষ পর্যন্ত সাড়ে ৭টার কিছু পরে মঞ্চে ওঠেন জিমি। সিয়াটল তাঁকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত ছিল, কিন্তু জিমির মনে ছিল পুরোনো অভিমান। গানের ফাঁকে তিনি গারফিল্ড হাইস্কুলে পড়ার সময়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, নিজের প্রতিভার স্বীকৃতি পেতে তাঁকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ছেড়ে দূরে যেতে হয়েছিল। জিমির গলা ধরে আসছিল, দর্শকেরা কেঁদেছিলেন তাঁর সঙ্গে।

পারফরম্যান্সের শুরুতে একজন নারী দর্শককে একটি গান উৎসর্গ করেন জিমি। এরপর নিজের ৯ বছর বয়সী বোন জেনিকে দেন জীবনের স্মরণীয় মুহূর্ত। ‘পার্পল হেইজ’ গানের সময় তিনি জেনির দিকে ইশারা করে গেয়ে ওঠেন—‘ওই মেয়েটি আমার ওপর জাদু করেছে।’ জেনি পরে বলেন, ‘ভাইয়া আমার দিকেই ইশারা করছিল, আর পুরো দর্শক বুঝতে চেষ্টা করছিল সে কাকে দেখাচ্ছে।’

মঞ্চের পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। বড় ত্রিপল টানানো হলেও অতিরিক্ত পানির ভারে সেটি নিচে ঝুলে পড়ত, কখনো জিমির মাথাও ছুঁয়ে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি ত্রিপলের নিচে যাওয়া বন্ধ করে দেন। শেলি জারমো স্মরণ করেন, ‘সে সম্পূর্ণ ভিজে গিয়েছিল। আঙুল, কপাল, গিটার—সবকিছু থেকে পানি পড়ছিল। আমি ভয় পাচ্ছিলাম, সে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে যাবে।’

প্রায় এক ঘণ্টার পরিবেশনায় জিমি গেয়েছিলেন ‘ফায়ার’, ‘মেসেজ টু লাভ’, ‘লাভার ম্যান’, ‘মেশিন গান’, ‘স্টার স্প্যাংলড ব্যানার’, ‘পার্পল হেইজ’, ‘ফ্রিডম’, ‘রেড হাউস’-এর মতো জনপ্রিয় গান। চমক হিসেবে ছিলেন ‘মিডনাইট লাইটনিং’ এবং ‘হে বেবি’। ‘মিডনাইট লাইটনিং’ গানটি জিমি সে বছরের মার্চে লিখেছিলেন এবং খুব কমই মঞ্চে পরিবেশন করেছিলেন। বৃষ্টির কারণে অনেক দর্শক অসুস্থতার ভয়ে আগেই মাঠ ছেড়েছিলেন, কিন্তু জিমির গানের কারণে নয়।

পরদিনও বৃষ্টির ধকল সামলাচ্ছিলেন জিমি। পরবর্তী অনুষ্ঠান ছিল হাওয়াইয়ে। সড়ক ব্যবস্থাপক জেরি স্টিকেলস তাঁকে নিতে বাড়িতে পৌঁছালে জিমির বাবা আল হেনড্রিক্স জানান, ছেলে ভালো অনুভব করছে না, এখনো ঘুমাচ্ছে। তাই তাঁকে না জাগানোর সিদ্ধান্ত হয়। পরদিন জিমি হাওয়াইয়ের উদ্দেশে রওনা হন। পরিবারের সদস্যরা বিমানবন্দরে পৌঁছে দেন। জেনি বলেন, ‘বিমানবন্দরে দৃশ্যটা অদ্ভুত ছিল। জিমি আর বাবা দুজনেই এদিক-ওদিক হাঁটছিলেন, একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিলেন। কেউ কিছু বলেননি। কিন্তু মনে হচ্ছিল, তাঁরা বুঝতে পারছেন—হয়তো আর কখনো দেখা হবে না।’

এর সাত সপ্তাহেরও কম সময় পর, ১৯৭০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৭ বছর বয়সে মারা যান জিমি হেনড্রিক্স। সিয়াটলের সেই বৃষ্টিভেজা রাতটি রইল তাঁর শেষ পূর্ণাঙ্গ কনসার্ট হিসেবে—যেখানে ঝড়, পানি ও মৃত্যুঝুঁকির মধ্যেও একজন শিল্পী শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাজিয়ে গেছেন তাঁর গিটার।