ফেসবুক অথবা ইনস্টাগ্রামের মতো মাধ্যমগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি প্রবণতা স্পষ্ট—এদের পূর্বের ঔজ্জ্বল্য ম্লান হয়ে আসছে। শুধু ব্যবসায়িক মডেলেই চাপ পড়েনি, এককালের অনুগত ব্যবহারকারীরাও দলে দলে বিমুখ হচ্ছেন। বর্তমানে প্ল্যাটফর্মগুলো অ্যালগরিদম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা সৃষ্ট কনটেন্ট ও বটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ব্যবহারকারীদের আচরণেও ব্যাপক রদবদল লক্ষণীয়। পূর্বে যেখানে ব্যক্তিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের জীবনের বিবিধ গল্প বা চিত্র ভাগাভাগি করতেন, বর্তমানে তারা কেবলই নিষ্ক্রিয় দর্শক। যান্ত্রিকভাবে নির্মিত ফিড শুধু ঊর্ধ্বমুখী স্ক্রল করে যাচ্ছেন তারা। মানসিক স্বাস্থ্যের অবক্ষয়, রাজনৈতিক কারসাজি ও নজরদারির আশঙ্কায় মানুষ এখন ক্ষুদ্রতর ও ব্যক্তিগত ডিজিটাল বলয়ে আশ্রয় খুঁজছে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হতেই পারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মৃত্যু ঘটছে। কিন্তু প্রকৃত সত্যটি হলো, এটি বিলীন হচ্ছে না; বরং কয়েক বছর ধরে নীরবে এর অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে এক বড় রকমের রূপান্তর সাধিত হচ্ছে। কাজেই সোশ্যাল মিডিয়া শেষ হয়ে যাচ্ছে কি না, সেই জিজ্ঞাসার চেয়ে বরং চিন্তা করা প্রয়োজন, এর অনুসরণে কী আসছে?

যেভাবে সোনালি যুগের পরিসমাপ্তি ঘটল, তার ইতিহাস নতুন নয়। নব্বইয়ের দশকে কম্পিউসার্ভ, আমেরিকা অনলাইন বা প্রডিজির মতো পরিষেবার মাধ্যমে ডিজিটাল যোগাযোগের সূত্রপাত ঘটে। আধুনিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গোড়াপত্তন ধরা যায় ২০০২ সালে ফ্রেন্ডস্টারের আগমনের মাধ্যমে। এক বছরের মধ্যে তাদের ব্যবহারকারী সংখ্যা ৩০ লাখে পৌঁছে যায়। ২০০৩ সালে পেশাজীবীদের জন্য লিংকডইন এবং একই সময়ে মাইস্পেসের আবির্ভাব ঘটে। ২০০৬ সালের মধ্যে মাইস্পেস গুগলের পরই বিশ্বের দ্বিতীয় জনপ্রিয় ওয়েবসাইটে পরিণত হয়। অতঃপর ২০০৮ সালের দিকে মাইস্পেসকে পেছনে ফেলে রাজত্ব কায়েম করে ফেসবুক। নিউজ ফিড ও লাইক বাটনের মতো বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে ফেসবুক মানুষকে এক জীবন্ত ও ব্যক্তিগত ডিজিটাল কমিউনিটি উপহার দেয়। অন্যদিকে টুইটার এসে গোটা বিশ্বকে যেন একটি বৈশ্বিক আড্ডাস্থলে রূপান্তরিত করে। স্থানীয় বন্ধুর সঙ্গে আলাপরত অবস্থাতেই হয়তো ভিন্ন দেশের কোনো তারকার সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া যেত। সেটাই ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্বর্ণযুগ। তখন কোনো বিরক্তিকর অ্যালগরিদম বা রাজনৈতিক মেরুকরণের বাড়াবাড়ি ছিল না। সমাজবিজ্ঞানীদের কাছেও এটি ছিল এক অমূল্য ভাণ্ডার; মানুষের আচরণ ও যোগাযোগের এত বিপুল তথ্যভাণ্ডার তারা আগে কখনও পাননি।

কিন্তু এই মনোরম বাস্তবতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০০৮ সালের পর থেকেই গোপনীয়তা বা ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে সঙ্কট শুরু হয়। মানুষের তৈরি কনটেন্টের স্থান দখল করতে থাকে অ্যালগরিদমের বিন্যস্ত ফিড। ইনফ্লুয়েন্সার, ব্র্যান্ডের প্রচারণা ও জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া বিজ্ঞাপনে পর্দা ভরে ওঠে। এই অধোগতির পেছনে সবচেয়ে বড় দায়ী হিসেবে অ্যালগরিদমকে চিহ্নিত করা হয়। অ্যালগরিদম উপলব্ধি করে যে মানুষ ক্রুদ্ধ বা বিরক্ত হলেই বেশি প্রতিক্রিয়া জানায়, মন্তব্য করে বা শেয়ার করে। তাই তারা ব্যবহারকারীদের সম্মুখে এমন সব উত্তেজক কনটেন্ট উপস্থাপন করতে থাকে, যা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে। এই প্রতিকূল পরিবেশ ও সাইবার বুলিংয়ের ভয়ে সাধারণ মানুষ নিজেদের মতামত প্রকাশ করা হ্রাস করে। টিকটক ও স্ন্যাপচ্যাটের মতো অ্যাপ্লিকেশনগুলো এসে মানুষকে সংক্ষিপ্ত ভিডিওর নেশায় আচ্ছন্ন করে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় দর্শকে পরিণত করে। অবস্থা এমন পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মূল কোম্পানি মেটা ২০২১ সালের পর থেকে নিজেদের আর সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি হিসেবে দাবিই করে না।

নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটেশনাল সোশ্যাল সায়েন্সের সহকারী অধ্যাপক পিটার টর্নবার্গ দীর্ঘকাল ধরে এ বিষয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর অভিমত অনুযায়ী, শুধু অ্যালগরিদম বা মানুষের স্বভাবকে দোষারোপ করলে চলবে না, সমস্যাটি নিহিত রয়েছে এই মাধ্যমগুলোর মৌলিক কাঠামোর অভ্যন্তরেই। আমরা প্রায়ই শুনে থাকি, সোশ্যাল মিডিয়া হলো প্রতিধ্বনি কক্ষ, যেখানে মানুষ শুধু নিজের মতের পক্ষের বক্তব্যই শোনে। টর্নবার্গের ভাষ্য মতে, এই ধারণা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। বরং বাস্তব জীবনের তুলনায় আমরা অনলাইনেই ভিন্নমতাবলম্বী মানুষের সম্মুখীন বেশি হই। তাহলে প্রকৃত সমস্যাটি কোথায়? সমস্যা হলো রাজনীতি বা সমাজ সম্পর্কে আমাদের ধারণার জায়গায়। আমরা ভাবি, মানুষ যুক্তি দিয়ে তর্ক করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু বাস্তবে রাজনীতি বা মানুষের বিশ্বাস যুক্তির চেয়েও বহুলাংশে পরিচয়, আবেগ ও সাংস্কৃতিক পছন্দের ওপর নির্ভরশীল। টর্নবার্গের ২০২২ সালের এক গবেষণায় প্রতীয়মান হয়, সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের স্থানীয় বা ক্ষুদ্র পরিমণ্ডল থেকে বের করে এনে জাতীয় বা বৈশ্বিক বিতর্কের সম্মুখে নিক্ষেপ করে। আগে হয়তো আপনি আপনার প্রতিবেশীর সঙ্গে একটি বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করলেও অন্য দশটি বিষয়ে একমত হয়ে মিলেমিশে থাকতেন। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের এমন এক মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে মতের অমিল মানেই আপনি আমার শত্রু। মানুষ এখন ভিন্নমতের ব্যক্তির কথা শুনলে পূর্বাপেক্ষা অনেক বেশি ক্ষুব্ধ হয়। এই বিভাজনের সূত্রপাত অবশ্য নব্বইয়ের দশকে কেবল টেলিভিশনের যুগেই আরম্ভ হয়েছিল। সোশ্যাল মিডিয়া তাকে কেবল উসকে দিয়েছে।

এই ব্যাপক পরিবর্তনের সম্মুখে দাঁড়িয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার ভবিষ্যৎ আসলে কী? টর্নবার্গের মতে, আমাদের সম্মুখে মূলত তিনটি পথ উন্মুক্ত রয়েছে। প্রথমত, মানুষ এখন উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম পরিত্যাগ করে হোয়াটসঅ্যাপ, ডিসকর্ড বা ইনস্টাগ্রামের প্রাইভেট গ্রুপ চ্যাটের দিকে ঝুঁকছে। একইসঙ্গে সাবস্ট্যাকের মতো স্থানগুলো জনপ্রিয়তা লাভ করছে, যেখানে ব্যক্তিরা অর্থ প্রদান করে শুধু নিজের পছন্দের ও বিশ্বস্ত লেখকদের রচনা পাঠ করেন। এই স্থানগুলোতে বটের উপদ্রব অপেক্ষাকৃত কম এবং এক ধরনের বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত, সংক্ষিপ্ত ভিডিওর আধিপত্য অব্যাহত থাকবে। টিকটক, ইনস্টাগ্রাম রিলস বা ফেসবুকের ভিডিওগুলো মানুষের কাছে এখন এক ধরনের পকেট টেলিভিশনের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৃতীয় এবং সর্বাপেক্ষা চমকপ্রদ প্রবণতাটি হলো উৎপাদনশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। পরিসংখ্যান বলছে, মানুষ এখন অনলাইনে অন্য মানুষের চেয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা চ্যাটবটগুলোর সঙ্গেই বেশি কথোপকথন চালাচ্ছে! আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, ফেসবুক-টুইটার ছেড়ে হোয়াটসঅ্যাপের কোনো প্রাইভেট গ্রুপে প্রবেশ করলেই আপনি নিরাপদ। কিন্তু টর্নবার্গ সতর্ক করে বলছেন, এই প্রাইভেট গ্রুপগুলোই ভবিষ্যতে প্রকৃত প্রতিধ্বনি কক্ষের কারখানায় পরিণত হতে পারে। আমরা এখন তথ্যপ্রযুক্তির এমন এক মৌলিক পরিবর্তনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি, যার প্রভাব ইন্টারনেট বা সোশ্যাল মিডিয়া আবিষ্কারের মতোই যুগান্তকারী হতে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনকে আমরা কীভাবে ইতিবাচক খাতে প্রবাহিত করব, তার উত্তর এখনো সম্পূর্ণ পরিষ্কার নয়। তবে আপনি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করুন বা নাই করুন, এই পরিবর্তনের প্রভাব থেকে কোনোভাবেই মুক্ত থাকতে পারবেন না। তাই সচেতন হওয়া ব্যতীত আমাদের সম্মুখে আপাতত অন্য কোনো বিকল্প নেই।