টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের প্রতি মানুষের মুগ্ধতা এখন আর শুধু পর্দার ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা বাস্তব জীবনের ভ্রমণ আচরণকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। সম্প্রতি এইচবিওর আলোচিত ধারাবাহিক 'হোয়াইট লোটাস'র নতুন মরশুমের শুটিং ফ্রান্সের সাঁ-ত্রোপে ও কান এলাকায় চলছে। ধারাবাহিকটির প্রতিটি সিজনই শুরু হয় এক রহস্যময় হত্যাকাণ্ড দিয়ে, আর এবার শুটিং লোকেশনের কাছাকাছি বান্দোল এলাকায় এক ফরাসি পর্যটকের আকস্মিক পতন দর্শকদের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। তবে এটি শুধু একটি কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং টিভি শো-র প্রভাবে পর্যটনের বদলে যাওয়া চিত্রের প্রতীকী উদাহরণ।
'সেট-জেটিং' নামে পরিচিত এই প্রবণতা বিলাসবহুল ভ্রমণ খাতকেও রূপান্তরিত করছে। পূর্ববর্তী সিজনগুলোতে মাউই, সিসিলি ও থাইল্যান্ডের লোকেশনে শুটিং হওয়া 'হোয়াইট লোটাস' ধারাবাহিকটি এখন বিলাসবহুল পর্যটনের অন্যতম প্রভাবশালী উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফিলাডেলফিয়াভিত্তিক বিলাসবহুল ট্রাভেল এজেন্সি ফোরার উপদেষ্টা জেসিকা একনাইয়ান সম্প্রতি চার সদস্যের একটি পরিবারের জন্য থাইল্যান্ড সফরের পরিকল্পনা করেন, যার বাজেট ছিল ৭৫ হাজার ডলার। ওই পরিবারটি বিশেষভাবে 'হোয়াইট লোটাস'-এর শুটিং হোটেলে থাকতে আগ্রহী ছিল। একনাইয়ান বলেন, 'এই ধরনের ভ্রমণে কল্পনার একটি মাত্রা যুক্ত হয়।' তবে তিনি দ্রুতই স্পষ্ট করে বলেন যে ধারাবাহিকটির ধনী চরিত্রগুলোর মতো হতে চান না তারা।
এই সেট-জেটিং প্রবণতা গন্তব্যস্থলগুলোর জন্য অর্থনৈতিক ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করছে। মন্টানা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নিও-ওয়েস্টার্ন ধারাবাহিক 'ইয়েলোস্টোন' ২০২১ সালে মন্টানায় ২১ লাখ পর্যটককে আকৃষ্ট করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা থেকে ৭৩ কোটি ডলারের বেশি রাজস্ব আয় হয়েছে। থাইল্যান্ডের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রচার বিভাগ জানিয়েছে, 'হোয়াইট লোটাস' ধারাবাহিকটি প্রচারের পর দেশটির পর্যটনে ৩০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই প্রবণতার নেতিবাচক দিকও রয়েছে। অতিপর্যটন ও মূল্যবৃদ্ধির মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে, যার ফলে কিছু বিলাসবহুল স্থাপনা নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছে। ক্রোয়েশিয়ার ওরেবিচ শহরের হোটেল কাতারিনার জেনারেল ম্যানেজার ওলগা ক্রিজমানিচ বলেন, 'ডুব্রোভনিক এখনও গেম অফ থ্রোনসের প্রভাব অনুভব করলেও আমাদের কাছে আসা পর্যটকরা অ্যাড্রিয়াটিকের প্রকৃত রূপ দেখতে চান, পপ সংস্কৃতির ছাঁচে তৈরি কোনো সংস্করণ নয়।'
সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থান এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। 'রোমান হলিডে' বা 'মার্ডার অন দি ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস'-এর মতো সিনেমার জমানায়ও সেট-জেটিং ছিল, কিন্তু বর্তমানে ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের প্রভাবে এর গতি অনেক বেড়ে গেছে। তিন মহাদেশে অফিস থাকা একটি ভ্রমণকেন্দ্রিক যোগাযোগ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা জুলস পেরোন মনে করেন, 'আমি বলবো যে এটি গন্তব্যস্থল ধ্বংস করছে।' তবে পেলোরাস ট্রাভেলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জিমি ক্যারল এই প্রবণতার পক্ষে বলেন, 'সেট-জেটিং মানুষকে গল্পের ভেতরে নিজেকে কল্পনা করার সুযোগ দেয়, শুধু ঘটনা দেখার বাইরে।' পিককের এমি-জয়ী রিয়েলিটি শো 'দ্য ট্রেইটরস'-এর প্রভাবে স্কটিশ হাইল্যান্ডসের দুর্গগুলোতে পর্যটকের ঢল নেমেছে। আর্ড্রস ক্যাসেলের ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে, ২০২৬ ও ২০২৭ সালের জন্য কোনো রিজার্ভেশনই পাওয়া যাচ্ছে না।
ফ্রান্সের কোট দাজুরে অবস্থিত জ্যানিয়ে ইলে দ্য বঁদোর রিসোর্টে এক সাংবাদিকের অভিজ্ঞতা এই সেট-জেটিং সংস্কৃতির আরেকটি উদাহরণ। ১৯৫০ সালে লিকার ব্যবসায়ী পল রিকার প্রতিষ্ঠিত এই রিসোর্টটি জোসেফিন বেকার ও সালভাদোর দালির মতো বিখ্যাত ব্যক্তিদের আড্ডাস্থল ছিল। সেখানে থাকাকালীন সাংবাদিক মনে করেন, 'যদি এটি হোয়াইট লোটাসের একটি আসল সিজন হতো, তাহলে এদের মধ্যে একজন বাঁচত না।' ঠিক সেই মুহূর্তে একটি মোটা মৌমাছি তার ম্যাগাজিনে এসে বসলে তিনি ভাবেন, 'আমি কি এলার্জিক? সত্যিই কি এটাই হবে সবচেয়ে বড় প্লট টুইস্ট?'
ঐতিহাসিকভাবে আইকনিক স্ক্রিন লোকেশনগুলো পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। ১৯৪২ সালের 'কাসাব্লাঙ্কা' সিনেমাটি মরক্কোয় শুটিং না হলেও সিনেমাটির কাল্পনিক রিক'স ক্যাফের নামে ২০০৪ সালে বাস্তবে একটি ক্যাফে খোলা হয়। ২০০৩ সালের 'লস্ট ইন ট্রান্সলেশন'-এর বেশিরভাগ শুটিং পার্ক হায়াত হোটেলে হয়েছে, যা সম্প্রতি সংস্কার করে পুনরায় চালু হয়েছে। জেমস বন্ড সিরিজের প্রতিটি সিনেমাই জ্যামাইকা থেকে নরওয়ে, মন্টে কার্লো পর্যন্ত বিভিন্ন গন্তব্যে শুটিং হয়েছে এবং মন্টে কার্লোর হোটেল মেট্রোপল বন্ড প্যাকেজ অফার করছে, যার মধ্যে কাস্টম টেইলরিং, হেলিকপ্টার ট্যুর ও প্রচুর মার্টিনি অন্তর্ভুক্ত।
সামগ্রিকভাবে, টিভি শো ও সিনেমার প্রভাবে পর্যটনের এই রূপান্তর যেমন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি স্থানীয় সম্প্রদায় ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবও ফেলছে। এই দ্বৈত প্রভাব ভবিষ্যতে পর্যটন শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।




