বিশ্ববিখ্যাত কলামিস্ট রেবেকা সোলনিট প্রায় নয় বছর আগে একটি জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধে বলেছিলেন, আমরা ভবিষ্যৎ না জানলেও অতীত আমাদের অনুপ্রেরণা, সাহস আর ধৈর্যের অফুরন্ত ভাণ্ডার। সেই অতীতের সম্পদকে কাজে লাগিয়েই আগামীর স্বপ্নগুলোকে বাস্তব করা সম্ভব। গভীর চিন্তা থেকে তিনি ‘আশা’ রাখার ওপর জোর দিয়েছিলেন, কিন্তু সেটি অলীক স্বপ্নের জন্য নয়। বরং আশা হলো মানুষের সেই অবোধ্য অভ্যন্তরীণ তাগিদ, যা জাগে যখন মানুষ নিজেকে দেখে আকাঙ্ক্ষা আর সংকটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে।
এই বক্তব্যকে ভিত্তি করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে ইতিহাসের গতিপথ নিয়ে এক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পরিবর্তনের প্রকৃতি উপলব্ধি করতে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। ফরাসি ঐতিহাসিক ফার্নান্দ ব্রদেল ইতিহাসের ধীর-বিবর্তনশীলতার ওপর আলো ফেলে বলেছিলেন, জলবায়ু বা ভূগোলের মতো কিছু মৌলিক অদৃশ্য শক্তি সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামো বদলায়। জার্মান দার্শনিক হেগেলের বিখ্যাত রূপক ‘মিনার্ভার প্যাঁচা কেবল গোধূলির আগমনেই ডানা মেলে’—এ কথাও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণের তাৎপর্য কেবল আত্ম-উপলব্ধির মাধ্যমেই বোঝা যায়।
হেগেল বলেছিলেন, তত্ত্ব আর বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধানই ইতিহাসের মূল চালিকা শক্তি। বাস্তবতা সব সময় যুক্তিসংগত, কারণ তা গভীরভাবে ঐতিহাসিক। যদিও মার্ক্সসহ অনেকে ইতিহাসকে মূর্তভাবে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন, তবে এ বিন্দুতে হেগেলই হয়তো সঠিক যে, বিশুদ্ধ সত্য যতই খোঁজা হয়, ততই বিমূর্ততার মুখোমুখি হতে হয়। সোলনিটের মতে, এ সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়াই আমাদের ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ায় আরও সক্রিয় হতে পারে।
একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বজুড়ে অনেক স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠেছে। কিছু সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছিল, কিছু ছিল নিপীড়ন ও অন্যায়ের প্রতিক্রিয়া। সব আন্দোলন সফল হয়নি। কিন্তু সেগুলোকে কেবল সাফল্য বা চূড়ান্ত ফলাফলের মাপকাঠিতে মূল্যায়ন করা চলে না। টিউনিসিয়া, মিসর ও আলজেরিয়ার প্রাথমিকভাবে অরাজনৈতিক মনে হওয়া বিক্ষোভগুলোকেও গভীরভাবে রাজনৈতিক বলা যায়, কারণ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বা স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে জনতার ঐক্যবদ্ধ হওয়া নাগরিক অধিকারেরই বিষয়।
স্পেনের ২০১১ সালের ‘প্রকৃত গণতন্ত্র’-এর দাবি, ইস্তাম্বুলের গেজি পার্ক রক্ষার আন্দোলন, হংকংয়ের ‘আমব্রেলা মুভমেন্ট’, কিংবা গ্রেটা থুনবার্গের জলবায়ু আন্দোলন—সবই নাগরিক অধিকারের রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারা। সুদানে ওমর আল-বশিরের সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে জাগরণ, বেলারুশের নাগরিকদের কারচুপিপূর্ণ নির্বাচনের প্রতিবাদ, জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর যুক্তরাষ্ট্রের গণজোয়ার, চিলি ও ফ্রান্সের নীতিমালাবিরোধী বিক্ষোভ, এবং ইরাক-লেবাননের গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলো এর ধারাবাহিকতা। সবশেষে ২০২৪ সালে জুলাই-এ বাংলাদেশের শিক্ষার্থী-জনতা এক সরকারকে পতন ঘটিয়েছে, যে সরকার টানা তিনটি কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল।
কার্নেগি এনডাউমেন্টের তথ্যানুযায়ী এখন বিশ্বের ৩১টি দেশে কোনো না কোনো ইস্যুতে আন্দোলন চলমান। বিগত এক বছরে ১৬টি আন্দোলন হয়েছে পরাধীন দেশগুলোতে, যাদের স্বাধীনতার স্বাদ কেবল আকাঙ্ক্ষা। এই আন্দোলনগুলোর দাবি আর ভবিষ্যৎ আছে। তবে প্রশ্ন ওঠে, এই আন্দোলনগুলো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে অসমর্থ হলে কি কোনো ফলাফল বহন করে না?
বিশ্লেষকের মতে, ‘পরিবর্তন’ সংক্রান্ত নিজস্ব ভাবনা নতুন করে ভাবার দরকার আছে। রেবেকা সোলনিটের ‘আনুষঙ্গিক সুফল’ ধারণার সূত্র ধরে বলা যায়, প্রতিটি আন্দোলনের একটি ধীর-বিবর্তনশীল সুফল থাকে যা তাৎক্ষণিকভাবে দৃষ্টিগোচর হয় না। ইতিহাস বলে, মহৎ উদ্দেশ্য থেকে জন্ম নেওয়া কোনো প্রচেষ্টাই বৃথা যায় না। আবার পশ্চিমা আলোকায়নের প্রতিটি অঙ্গীকার সময়ান্তরে অন্ধকারে হারিয়েছে। জার্মান চিন্তাবিদ ভাল্টার বেনিয়ামিন লিখেছিলেন, সভ্যতার কোনো দলিল বর্বরতামুক্ত নয়। আবার তিনিই বলেছেন, ব্যর্থতার ধ্বংসস্তূপেও পরিত্রাণের উপায় খোঁজার।
বেনিয়ামিনের সমসাময়িক আন্তোনিও গ্রামসি ভাইকে লেখা এক চিঠিতে বলেন, ‘আমি বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে হতাশাবাদী, কিন্তু ইচ্ছাশক্তির দিক থেকে আশাবাদী।’ তাঁর এই ‘ইচ্ছাশক্তি’ হলো বিশ্বকে বদলানোর এক অবিচল অঙ্গীকার, যখন যুক্তি বলে সাফল্যের সম্ভাবনা ক্ষীণ। হতাশার কাছে নতিস্বীকার না করে কাজ করে যাওয়াই তাঁর আশাবাদের সারমর্ম। আজ বাংলাদেশের জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে এই আশাবাদ জরুরি। সাফল্যের প্রচলিত মাপকাঠিতে ব্যর্থতার কথা মনে রেখেও বয়ানের লড়াইয়ে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতার পার্থক্যকে স্বীকার করেই সেই ‘অপরিহার্য ব্যর্থতা’কে বুঝতে হবে, যা প্রকৃত আশার পথ খুলে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের আশা জোগায়।


