প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের জন্য নতুন ঘটনা নয়। প্রতিবছর বন্যা, অতিবৃষ্টি বা ঘূর্ণিঝড়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়, ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ বা পরীক্ষা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রশ্ন হলো, শুধু পরীক্ষার তারিখ পিছিয়েই দায়িত্ব শেষ হয়, নাকি শিক্ষার্থীর হারানো সময় পুরোপুরি ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই? চলতি জুলাই মাসে টানা বৃষ্টি ও বন্যায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের একাধিক এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে, যা হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জন্য অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির এ সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ না করলেও ফল প্রকাশ, উচ্চশিক্ষা ও চাকরির পরিকল্পনায় বিলম্ব নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

শিক্ষা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যেখানে একটি শ্রেণি বা পরীক্ষা মিস করা সব শিক্ষার্থীর জন্য এক রকম প্রভাব ফেলে না। বিদেশে উচ্চশিক্ষার আবেদন বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এমন শিক্ষার্থীর জন্য কয়েক সপ্তাহের বিলম্ব বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একটি স্থগিত পরীক্ষা পুরো একাডেমিক ক্যালেন্ডারকে এলোমেলো করে দেয়, যার প্রভাব পড়ে সেমিস্টার শুরু, গবেষণার সময়সূচি ও ডিগ্রি অর্জনে। শেষ পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ক্ষতি যেমন হয়, তেমনি দেশের উৎপাদনশীল জনশক্তি তৈরির প্রক্রিয়াও শ্লথ হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। ইউনেসকো বারবার শিক্ষাব্যবস্থাকে সহনশীল করার পরামর্শ দিলেও বাংলাদেশে সেই প্রস্তুতি এখনো সীমিত। ইউনিসেফের তথ্য অনুসারে, শুধু ২০২৪ সালেই জলবায়ুজনিত দুর্যোগে দেশের প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ শিশুর শিক্ষা কোনো না কোনোভাবে ব্যাহত হয়েছে। করোনা মহামারির সময় অনলাইন ক্লাস ও ডিজিটাল শিক্ষা কিছুটা বিকল্প পথ দেখালেও ডিজিটাল বৈষম্যের কারণে অনেক শিক্ষার্থী সেই সুযোগ পায়নি।

শুধু শিক্ষার্থী নয়, দুর্যোগের সময় শিক্ষক ও কর্মচারীর নিরাপত্তাও সমান গুরুত্ব পায় না। পরীক্ষা স্থগিত রেখে অনেক প্রতিষ্ঠানে তাদের নিয়মিত অফিস করতে হয়, যা ঝুঁকি সমানভাবে বণ্টনের নীতির পরিপন্থী। অঞ্চলভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়নের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে না তুললে একই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে দুর্যোগের সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা মানবিক উদ্যোগ হলেও দ্রুত শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালুর পরিকল্পনা থাকা দরকার।

শিক্ষা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, ব্যয় নয়। বারবার বাধাগ্রস্ত শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে ডাক্তার, প্রকৌশলী বা প্রশাসক হবে। তাদের শিক্ষাজীবনের প্রতিটি বিলম্ব দেশের উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেয়। তাই দুর্যোগকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষায় প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, নমনীয় একাডেমিক ক্যালেন্ডার ও দ্রুত পুনরুদ্ধার কৌশলকে অপরিহার্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। একটি ভাঙা সেতু মেরামত করা যায়, কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর হারিয়ে যাওয়া সময় ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। তাই শিক্ষা খাতকে শুধু পরিসংখ্যানে নয়, জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে।