ঢাকায় বৃষ্টি এখন কেবল আবহাওয়ার ঘটনা নয়, বরং নগর সংকটে পরিণত হয়েছে। আকাশে মেঘ করলেই নগরবাসী উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। অফিসের সময় বৃষ্টি এলে যানজটে আটকে থাকার ভয়ে মানুষ মোবাইলে আবহাওয়ার খবর দেখেন। এক ঘণ্টার বৃষ্টি যেন তিন ঘণ্টার যানজটের কারণ হয়। এই অবস্থায় বারবার বলা হয় আরও বড় ড্রেন বানাতে হবে, আরও পাম্প বসাতে হবে। তবে প্রশ্ন হলো, এত বছর পরও কেন একই সমস্যা ফিরে আসে? কারণ সমস্যাটিকে ভুল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে। বৃষ্টির পানি যত দ্রুত সম্ভব শহরের বাইরে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়, কিন্তু বর্ষাকালে খাল, নদী ও আউটফলগুলো নিজেরাই পূর্ণ থাকে। তখন ড্রেনে পানি আসলেও বের হওয়ার জায়গা থাকে না।

এই অবস্থায় নতুন চিন্তা হিসেবে প্রস্তাব করা হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানি ধারণব্যবস্থা। রাস্তার নিচে বা ফুটপাতের তলায় বড় আকারের কংক্রিট ট্যাংক তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে বৃষ্টির পানি ড্রেনের মাধ্যমে জমা হবে। বাইরে থেকে বোঝার উপায় থাকবে না যে ওই জায়গায় পানি সংরক্ষিত হচ্ছে। ফলে রাস্তার ওপর পানি জমবে না, যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক থাকবে এবং নগরজীবন অচল হবে না। এই আধারগুলো শহরের জন্য অস্থায়ী জলব্যাংক হিসেবে কাজ করবে, যেখানে বৃষ্টির সময় অতিরিক্ত পানি থাকে।

প্রচলিত ধারণা হলো বৃষ্টির পানি সঙ্গে সঙ্গে বের করে দিতে হবে। কিন্তু নদীর পানি উঁচু থাকলে বা জোয়ারের কারণে নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হলে এই পদ্ধতি অকার্যকর হয়। কয়েক ঘণ্টার জন্য পানি সংরক্ষণ করে পরে অপসারণ করা প্রকৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে বেশি যৌক্তিক। রাতে শহর ফাঁকা থাকায় রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে বিশেষ পাম্প ট্রাক ব্যবহার করে সংরক্ষিত পানি নির্ধারিত খাল বা জলাধারে সরিয়ে নেওয়া যেতে পারে। এতে দিনের বেলা যানজট সৃষ্টি হবে না এবং নতুন স্থায়ী পাম্পিং স্টেশনের প্রয়োজন কমবে।

জলাবদ্ধতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি সময়ের অপচয়। মাত্র আধা ঘণ্টার পানি জমে হাজার হাজার মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। অফিসে দেরি, ব্যবসায়িক ক্ষতি, জ্বালানি অপচয় ও জরুরি সেবায় বিলম্বের মতো ঘটনা ঘটে। তাই জলাবদ্ধতা সমাধানকে ড্রেনেজ প্রকল্প নয়, নগর অর্থনীতি রক্ষার বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।

প্রথমে জলাবদ্ধতাপ্রবণ কয়েকটি মোড় বা সড়কে পরীক্ষামূলকভাবে এই ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। সফল হলে পুরো শহরে সম্প্রসারণ সম্ভব। এতে ঝুঁকি কমবে, আর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরিকল্পনা উন্নত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে আরও তীব্র বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। পুরোনো ড্রেনেজ দর্শন দিয়ে সেটি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। প্রয়োজন স্মার্ট ড্রেনেজ—এমন ব্যবস্থা যা বুঝবে কখন পানি সরাতে হবে, কখন সংরক্ষণ করতে হবে এবং কখন অপসারণ করতে হবে। ভবিষ্যতে ঢাকা এমন শহর হবে, যেখানে বৃষ্টির পানি রাস্তায় জমবে না, বরং অদৃশ্যভাবে রাস্তার নিচে সংরক্ষিত থাকবে যতক্ষণ না শহর নিরাপদে সেটি সরানোর জন্য প্রস্তুত হয়।