রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে এক টুকরো প্রশান্তির ঠিকানা হয়ে উঠেছে আগারগাঁওয়ের পুরোনো বাণিজ্য মেলা মাঠে চলমান জাতীয় বৃক্ষমেলা। কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও কংক্রিটের জঞ্জাল, যানজট ও ধুলোময় জীবন থেকে মুক্তি পেতে প্রতিদিনই ভিড় জমাচ্ছেন নগরবাসী। বন বিভাগের এই আয়োজন প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত এবং এতে প্রবেশের জন্য কোনো টিকিটের প্রয়োজন হয় না। ৭ আগস্ট পর্যন্ত চলার কথা থাকলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় মেলার মেয়াদ বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
মেলার প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে প্রায় আড়াই হাজার প্রজাতির বৃক্ষের অপূর্ব সমাহার। দেশীয় ফলের গাছের পাশাপাশি চিয়াংমাই, মিয়াজাকি ও আমেরিকান রেড পালমারের মতো বিদেশি আমের চারা, রাম্বুটান, অ্যাভোকাডো, কিউই, ড্রাগন ফল, ভিয়েতনামি কাঁঠাল ও মিসরীয় ডুমুরের মতো বিচিত্র গাছের চারা একসঙ্গে দেখার সুযোগ মিলছে। ১২০টি স্টলের এই আয়োজনে সরকারি-বেসরকারি নার্সারিগুলো ছাড়াও আছে দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে তথ্যকেন্দ্র, প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা, বিশ্রামাগার এবং ব্রেস্টফিডিং কর্নার।
ছোট ফ্ল্যাট বা অফিসের বারান্দার সাজসজ্জায় আগ্রহী তরুণ ক্রেতাদের মূল আকর্ষণ ইনডোর প্ল্যান্ট। সানসেভেরিয়া, মনস্টেরা, অ্যানথুরিয়াম ও ক্যাকটাসের পাশাপাশি দৃষ্টিনন্দন টেরারিয়ামের সামনে ভিড় লক্ষণীয়। রিকল গ্রিনের স্টলে থাইল্যান্ড থেকে আনা নানা অর্নামেন্টাল গাছ, সেলফ-ওয়াটারিং টবে লাগানো মানি ট্রি এবং এয়ার প্ল্যান্ট দেখা যাচ্ছে। স্টল পরিচালকদের ভাষ্য অনুযায়ী, টেরারিয়ামের রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত সহজ; প্রত্যহ পাঁচ-ছয় ঘণ্টা আলো আর মাসে দু-তিনবার হালকা পানি স্প্রে করলেই এগুলো সতেজ থাকে। মেলা উপলক্ষ্যে এক হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল্যের ইনডোর প্ল্যান্ট ও টেরারিয়াম বিক্রি হচ্ছে।
বাঁশের বিচিত্র জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে কোয়ান্টাম ব্যাম্বুরিয়ামের স্টল। দেশীয় ৩০ প্রজাতির পাশাপাশি এখানে সংগ্রহে রয়েছে প্রায় ৬০ প্রজাতির দেশি-বিদেশি বাঁশ এবং ১১০ প্রজাতির বিরল বনজ গাছ। বাঁশ দিয়ে তৈরি নান্দনিক বসার জায়গা ও বাঁশপাতার চায়ের মতো ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা দর্শকদের টানছে। বাঁশের নানা ব্যবহার্য ও শৌখিন সামগ্রীও পাওয়া যাচ্ছে এখান থেকে।
মেলার ভেতরে আরেকটি ব্যতিক্রমী স্থান হলো ‘বনকুটির’। গার্ডেনিং বাংলাদেশের উদ্যোক্তা রকিবুল আমিনের ভাবনায় নির্মিত এই কুটিরটির সামনে পদ্মপাতায় সাজানো সরু জলাশয়ে রঙিন মাছ সাঁতার কাটছে। পাশে বাঁশের তৈরি পানির ঝরনা, ঘাসের লন ও পাথরের হাঁটার পথ যেন শহরের বুকে গ্রামবাংলার এক টুকরো ছবি হয়ে এসেছে দর্শকদের মুগ্ধ করছে। তাঁর লক্ষ্য, সামান্য জায়গায়ও সবুজের ছোঁয়া পৌঁছে দেওয়া।
কেবল গাছ কেনাই নয়, এই মেলা হয়ে উঠেছে বাগানপ্রেমীদের জন্য এক ছাতার নিচে পরিপূর্ণ আয়োজন। টব, জৈব সার, গ্লাভস, কাস্তে ও শাবলের মতো বাগানের যাবতীয় সরঞ্জাম এখানে মিলছে। পাশাপাশি ছাদবাগান বা গাছের পরিচর্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে বিনা মূল্যে পরামর্শ নেওয়ার সুযোগও রয়েছে। বিক্রেতারা জানান, বয়োজ্যেষ্ঠ দর্শকদের ঝোঁক দেশি ফলের গাছের দিকে, আর তরুণরা ঝুঁকছেন বিদেশি প্রজাতি ও ইনডোর প্ল্যান্টের প্রতি। সব মিলিয়ে, গাছ কেনাবেচার পাশাপাশি এই আয়োজন শহুরে জীবনে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের নতুন করে তাৎপর্য উপস্থাপন করছে।



