বাজারের বরফের ওপর সাজানো রূপালি, চ্যাপটা এক মাছ—রুপচাঁদা। নামটির মতোই এর রূপ চোখে পড়ার মতো, কিন্তু এই স্বতন্ত্র গড়ন নিছক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর কার্যকারণ। সমুদ্রের প্রতিটি বৈশিষ্ট্যই অভিব্যক্তির ফল। রুপচাঁদার শরীর প্রায় কাগজের মতো পাতলা, যা একে পানির নিচে প্রায় অদৃশ্য করে তোলে।

উপর থেকে কোনো বড় শিকারি মাছ খাবারের খোঁজে তাকিয়ে থাকলে, মোটা দেহের একটি স্পষ্ট ছায়া দেখা যায়। কিন্তু রুপচাঁদার পাতলা শরীর পানির নিচে একটা সরু রেখা বা আলোর ক্ষীণ ঝিলিক ছাড়া কিছুই মনে হয় না। এর ওপরের অংশ গাঢ় আর নিচের অংশ হালকা রঙের হওয়ায় (যাকে বিজ্ঞানীরা কাউন্টারশেডিং বলেন) চ্যাপটা গঠনের সঙ্গে মিলে শিকারির চোখে ধরা পড়া আরও দুরূহ হয়ে ওঠে।

গতির বিবেচনায়ও এই গঠন সহায়ক। পানি বাতাসের তুলনায় অনেক বেশি ঘন। মোটা দেহ নিয়ে তা ঠেলে এগোতে প্রচুর শক্তি ক্ষয় হয়। রুপচাঁদার চ্যাপটা দেহ সেই প্রতিরোধ কমিয়ে দেয়, বিশেষত যখন এটি পাশ ফিরে সাঁতার কাটে। এ কারণে এটি অতি সহজে বাঁক বদলাতে পারে, মুহূর্তের মধ্যে দিক পাল্টে শিকারির হাত এড়াতে সক্ষম হয়। এই ক্ষিপ্রতাই তার বাঁচার মূল কৌশল।

পানির মধ্যভাগে ভেসে প্ল্যাংকটন ও ক্ষুদ্র জলজ প্রাণীর খোঁজ করাই রুপচাঁদার স্বভাব। চ্যাপটা গঠনের জন্য পানির ভিন্ন স্তরে ওঠানামা করতেও তার কম শক্তি খরচ হয়। আবার অধিকাংশ সময় দলবদ্ধভাবে সাঁতার কাটার ফলে, বহু চ্যাপটা ও রূপালি দেহ একসঙ্গে আলো প্রতিফলিত করায় শিকারির চোখে একধরনের বিভ্রম তৈরি হয়। কতগুলো চকচকে তলে বাঁধা দেহের মধ্য থেকে সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।

সমুদ্রের সব মাছের দেহ চ্যাপটা নয়; ভিন্ন ইলস্ট্রেশন ও শিকার প্রক্রিয়ার জন্য ভিন্ন গড়ন প্রয়োজন। কিন্তু রুপচাঁদার জীবনযাপন পদ্ধতি, ভোজনাভ্যাস ও চলার ধরনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বহু প্রজন্ম ধরে ধীরে ধীরে তার এই দেহবিন্যাস গড়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের উপকূলে রুপচাঁদার কয়েকটি প্রজাতি পাওয়া যায়, যার মধ্যে সাদা রুপচাঁদা সবচেয়ে পরিচিত। রুপালি-সাদা দেহ, ছোট মাথা ও বড় বড় চোখই এর বৈশিষ্ট্য। প্রজাতিভেদে সামান্য তফাৎ থাকলেও চ্যাপটা আকৃতির মূল কাঠামো অক্ষুণ্ন রয়েছে। মাঝেমধ্যে জালে ধরা পড়লেও এই চ্যাপটা আকৃতি জেলেদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। মাছটি জালের সরু ফাঁক গলে পালানোর সামর্থ্য রাখে, যা সমুদ্রে টিকে থাকার এই অভিযোজনই জালের ভেতরেও তাকে একটি বাড়তি সুযোগ করে দেয়।

তাই বাজার করতে গিয়ে রুপচাঁদার দিকে তাকালে দামের কথা ভাবার আগে এই মুদ্রার মতো চকচকে, পাতলা দেহের দিকে খেয়াল করলে বোঝা যায়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে সমুদ্রে কীভাবে চোখকে ফাঁকি দিয়ে, শক্তি বাঁচিয়ে টিকে থাকা যায়—সেই দীর্ঘ প্রয়াসের এক সুচারু রূপ। সূত্র: ফিশ ফার্মিং বিডি