ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে এবার তিন মহাদেশীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো একজোট হয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। উয়েফা, কনক্যাকাফ এবং এএফসি'র পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক খোলা চিঠিতে ফুটবলকে ‘কোনো ব্যক্তির একক সম্পত্তি নয়’ বলে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাগুলোর অভিযোগ, ইনফান্তিনো ‘প্রতারণার মাধ্যমে’ তাদের আস্থা ভঙ্গ করেছেন এবং নিজেকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন।

এই তিন সংস্থার সভাপতি ও সচিবদের স্বাক্ষরিত চিঠিতে ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) প্রকল্পকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের দিকেই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। মূলত ফিফা বিশ্বকাপসহ সকল প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক ও টিকিটিং স্বত্ব দেখভালের জন্য একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ার পরিকল্পনা ছিল, যার ২১ শতাংশ শেয়ার একটি বেসরকারি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির কথা ছিল। তবে এএফসি, কনক্যাকাফ ও উয়েফার তীব্র বিরোধিতার মুখে গত ১ আগস্ট পরিকল্পনা থেকে সরে আসে ফিফা। উয়েফা এমনকি ফিফার সব প্রতিযোগিতা বর্জনের হুমকিও দিয়েছিল।

খোলা চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, প্রতারণার মাধ্যমে বিশ্বাস ভঙ্গ করা এবং কোনো ব্যক্তি নিজেকে সবার ওপরে স্থান দিলে তিনি মূলত নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্যকেই বিসর্জন দেন। সংস্থাগুলোর মতে, ফুটবলের নেতৃত্ব ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার বিষয় নয়, বরং এটি ফুটবল পরিবারের সেবা করার একটি আমানত। বিবৃতিতে সরাসরি ইনফান্তিনোর নাম উল্লেখ না করা হলেও, বিবিসি স্পোর্টের সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই চিঠিকে সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করার একটি সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এর আগেই ইনফান্তিনোর ওপর আস্থা হারানোর কথা জানিয়েছিল উয়েফা। নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশন তাঁকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছে, আর খেলোয়াড়দের সংস্থা ফিফপ্রো ‘ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের’ অভিযোগ তুলেছে। এমনকি ইনফান্তিনো ক্ষমা চাওয়ার পরও বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি উয়েফা।

আগামী মার্চে মরক্কোর রাবাতে ফিফা সভাপতি নির্বাচনে চতুর্থ ও শেষ মেয়াদের জন্য লড়বেন ইনফান্তিনো। কনক্যাকাফ সভাপতি ভিক্টর মন্তালিয়ানি তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী, আগামী ১৮ নভেম্বরের মধ্যে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করতে হবে।

তবে ইনফান্তিনোর পক্ষেও সমর্থন রয়েছে। মরক্কোয় এক বৈঠকে ফিফার শীর্ষ নির্বাহীরা তাঁর নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল ফেডারেশন (কনমেবল) এবং কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবলও (সিএএফ) তাঁর পাশে আছে। আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, প্যারাগুয়ে, কাতার ও কুয়েতের সমর্থনও পেয়েছেন তিনি।

গত শনিবার ফিফার এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়, ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ইনফান্তিনোকে ‘দুর্বল করার জন্য একটি সুসংগঠিত ও নিরবচ্ছিন্ন চক্রান্ত’ চলছে। তাঁর নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে গেলে ফিফার গঠনতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে বলেও জানানো হয়।

কিন্তু মরক্কোর ওই বৈঠককে অর্থহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে তিন মহাদেশীয় সংস্থা। তাদের মতে, জুরিখে ফিফার মূল কার্যালয়ে না গিয়ে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মুখোমুখি না হয়ে এবং সম্পূর্ণ কমিটিকে না ডেকে গুটিকয়েক সদস্যকে বিদেশে এনে জরুরি বৈঠক করাটা সংশয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের ভাষায়, এ ধরনের আচরণ ফুটবলের কোনো অভিভাবকের হতে পারে না; এটি এমন এক ব্যক্তির আচরণ, যিনি মনে করেন ফুটবল তার কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য।

তিন মহাদেশীয় সংস্থার যৌথ চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সহসভাপতি ও ২১১টি সদস্যদেশের কাছে পাঠানো সাম্প্রতিক চিঠিতে ফিফা স্বীকার করেছে প্রক্রিয়ায় ভুল হয়েছিল। তবে ফিফা বিষয়টিকে কেবল ‘যোগাযোগের ঘাটতি’ হিসেবে দেখাতে চাইলেও ফুটবলবিশ্ব এটিকে ‘বিচক্ষণতার চরম ব্যর্থতা’ হিসেবেই দেখছে।