গত সপ্তাহে প্রেক্ষাগৃহে এসেছে ক্রিস্টোফার নোলানের মহাকাব্যিক ‘দ্য অডিসি’। হোমারের অমর কাব্যের চলচ্চিত্রায়ণ ইতিমধ্যে বক্স অফিসে ৩৬৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছে। ম্যাট ডেমন অভিনীত এই সিনেমা নিয়ে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। তবে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে—এই সিনেমা দেখার আগে কী কোনো প্রস্তুতি প্রয়োজন? বিশেষজ্ঞদের মতে, সরাসরি কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলেও গল্পের গভীরতা উপভোগ করতে ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া উলফগ্যাং পিটারসেনের ‘ট্রয়’ সিনেমাটি দেখা যেতে পারে। কারণ, ‘দ্য অডিসি’র ঘটনা শুরু হয় যেখানে ‘ট্রয়’ শেষ হয়েছিল—ট্রয় যুদ্ধের পর।

ট্রয় যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল এক কূটনৈতিক সফর থেকে। ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিস ও হেক্টর স্পার্টায় গেলে স্পার্টার রানি হেলেনের সঙ্গে প্যারিসের প্রেম হয়। হেলেনকে নিয়ে তিনি ট্রয়ে ফিরে আসেন। গ্রিক পুরাণে এটিকে প্রেম নাকি অপহরণ—দুই রকম ব্যাখ্যা আছে। তবে ফলাফল ছিল ভয়াবহ। স্পার্টার রাজা মেনেলাউস অপমানিত বোধ করেন এবং তাঁর ভাই আগামেমনন এটিকে যুদ্ধের সুযোগ হিসেবে দেখেন। অ্যাকিলিস, ওডিসিয়ুস, অ্যায়াক্সের মতো বীরদের একত্র করে শুরু হয় ট্রয় যুদ্ধ। এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করেই হোমার রচনা করেন ‘দ্য ইলিয়াড’ ও ‘দ্য অডিসি’।

‘ট্রয়’ সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর চরিত্রায়ন। অ্যাকিলিস চরিত্রে ব্র্যাড পিটের অভিনয় দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে তাঁর আত্মবিশ্বাস, অহংকার ও মানবিক দ্বন্দ্ব। অন্যদিকে হেক্টর চরিত্রে এরিক বানা পরিবার ও শহর রক্ষার দায়িত্বকে প্রাধান্য দেন। শেষ পর্যন্ত অ্যাকিলিস ও হেক্টরের দ্বন্দ্বযুদ্ধ দুই ভিন্ন দর্শনের লড়াইয়ে পরিণত হয়। এ দৃশ্য হলিউডের অন্যতম স্মরণীয় যুদ্ধদৃশ্য হিসেবে বিবেচিত।

দুই দশক পেরিয়ে গেলেও ‘ট্রয়’-এর নির্মাণশৈলী চোখে পড়ার মতো। হাজারো সৈন্যের যুদ্ধ, ট্রয়ের বিশাল দুর্গ, সমুদ্রজুড়ে যুদ্ধজাহাজ—সবকিছুই দর্শককে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রত্যক্ষদর্শী করে তোলে। জেমস হর্নারের আবহসংগীত উত্তেজনা ও আবেগ দুটোই বাড়িয়ে দেয়।

তবে ‘ট্রয়’ দেখার মূল কারণ হলো এটি ‘দ্য অডিসি’র গল্পের ভিত্তি তৈরি করে। প্রথমত, ট্রয় যুদ্ধের প্রেক্ষাপট জানলে ‘দ্য অডিসি’তে বর্ণিত ঘটনাগুলো সহজে বোঝা যায়। দ্বিতীয়ত, অডিসিয়ুস চরিত্রটি আগে থেকে চিনতে পারলে তাঁর বুদ্ধি ও কৌশলের গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়। ট্রোজান হর্সের পরিকল্পনা তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত। তৃতীয়ত, অডিসিয়ুসের বাড়ি ফেরার দীর্ঘ ও বেদনাভরা যাত্রার গুরুত্ব বোঝা যায়। ‘ট্রয়’ দেখলে বুঝবেন, তিনি শুধু বাড়ি ফিরছেন না, দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তি ও অতীতের ভার বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

জেনে রাখা ভালো, ‘ট্রয়’ হোমারের ‘দ্য ইলিয়াড’-এর হুবহু চলচ্চিত্ররূপ নয়। পরিচালক উলফগ্যাং পিটারসেন গল্পটিকে আরও বাস্তবধর্মী করে তুলেছেন। গ্রিক দেবতাদের সরাসরি হস্তক্ষেপ বাদ দেওয়া হয়েছে। মেনেলাউস, হেলেনসহ কয়েকটি চরিত্রের উপস্থাপনায় পরিবর্তন রয়েছে। তবে এসব পরিবর্তন সিনেমাটির গুরুত্ব কমায়নি; বরং গ্রিক পুরাণের প্রথম পরিচয় হিসেবে এটি সহজবোধ্য হয়েছে।

মজার বিষয় হলো, ‘ট্রয়’ নির্মাণের প্রস্তাব পেয়েছিলেন ক্রিস্টোফার নোলান নিজেও। কিন্তু কোনো কারণে তা হয়নি। দুই দশকের বেশি সময় পর তিনি ‘দ্য অডিসি’ নিয়ে ফিরলেন। তাই নোলানের ‘দ্য অডিসি’ দেখার আগে ‘ট্রয়’ দেখলে অভিজ্ঞতা আরও অর্থবহ হতে পারে বলে মনে করছেন চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞরা।