বেশিরভাগ মানুষের জন্য জন্মদিন বছরে একবার আসে, কিন্তু ফেরান তোরেসের ক্ষেত্রে সেটি চার বছরে একবার ঘটে, কারণ তার জন্ম ২৯ ফেব্রুয়ারি। তবে এখন থেকে আর সেই দীর্ঘ অপেক্ষার প্রয়োজন নেই—গতকাল ১৯ জুলাই তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোলটি এই দিনটিকে তার জন্য বিশেষ অর্থ দান করেছে। স্পেনকে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি এনে দেওয়া সেই গোলটি তাকে চিরকাল স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসে জায়গা করে দিয়েছে।

বিশ্বকাপজুড়ে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলে নিয়মিত একাদশের অংশ ছিলেন না তিনি। পূর্ববর্তী ম্যাচগুলোতে বদলি নেমেও বিশেষ কিছু করতে না পারায় সমালোচনার শিকার হতে হয়েছিল। কিন্তু ফুটবলের এই ধর্মই যে একটি মাত্র মুহূর্ত পুরো ক্যারিয়ারের চিত্র বদলে দিতে পারে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচেও দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত তিনি বেঞ্চে ছিলেন। ১০৬তম মিনিটে পেদ্রো পোরোর ক্রস থেকে নিকো উইলিয়ামসের হেডের পর বল জালে জড়িয়ে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেন এই উইঙ্গার। পুরো টুর্নামেন্টে এটি ছিল তার একমাত্র গোল, কিন্তু তার চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই হতে পারে না।

ম্যাচ শেষে উচ্ছ্বসিত তোরেস বলেন, এটি একটি বিরাট স্বস্তি। পুরো আসরে তাকে প্রচুর সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছে, কিন্তু ভাগ্যের নিজস্ব একটি চিত্রনাট্য থাকে এবং ঈশ্বর তাকে লড়ে যাওয়ার শক্তি দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রাপ্য মানুষই প্রাপ্য জিনিস পান। তোরেসের শরীরের ট্যাটুগুলো তার সংগ্রামের জীবন্ত চিহ্ন। গোড়ালিতে নোঙরের পাশে লেখা ‘আই রিফিউজড টু সিঙ্ক’ অর্থাৎ ‘আমি ডুবে যেতে চাই না’, আর পিঠে ফিনিক্স পাখির ডানার ট্যাটু ও লেখা—চেষ্টা করো, ব্যর্থ হও, আবার উঠে দাঁড়াও। এই কথাগুলো যেন তার জীবনদর্শন ও ক্যারিয়ারেরই সারসংক্ষেপ।

২০২২ সালে ম্যানচেস্টার সিটি থেকে ৫৫ মিলিয়ন ইউরোতে বার্সেলোনায় আসার পর প্রত্যাশার চাপ ছিল প্রবল। প্রথম আড়াই বছরে ১১৩ ম্যাচে মাত্র ২৫ গোল করতে পেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে মনোবিদের শরণাপন্ন হতে হয়। সেই সময় তিনি উপলব্ধি করেন, গোলের পেছনে ছুটতে ছুটতে ফুটবলের আনন্দই ভুলে যাচ্ছিলেন। এরপরই নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন এবং ‘এল তিবুরোন’ (হাঙর) ডাকনাম রাখেন, কারণ হাঙর সব সময় সামনে এগিয়ে চলে, থেমে থাকে না। গোল উদযাপনে তাই দুই হাত দিয়ে হাঙরের চোয়ালের ভঙ্গি করেন তিনি। বার্সেলোনায় ধীরে ধীরে তার গল্প বদলায়—সর্বশেষ দুই মৌসুমে ৯৪ ম্যাচে করেন ৪০ গোল, তবে জাতীয় দলে সামর্থ্য প্রমাণ করাটা বাকি ছিল।

নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে সেই বাকি কাজটিই সারেন তোরেস। বিশ্বকাপ জয়ের পর তিনি বলেন, এই গোল শুধু তার একার নয়, বরং পুরো স্পেনের ৪ কোটি ৭০ লাখ মানুষের গোল। ফাইনালে তার অবদান শুধু গোলেই সীমাবদ্ধ ছিল না—মাত্র ৫৮ মিনিট মাঠে থেকেও প্রতিপক্ষের বক্সে সর্বাধিক সাতবার বল স্পর্শ করেন এবং একবার নয়, দুবার জালে বল পাঠান; একটি অফসাইডে বাতিল হয়। এই গোলকে আরও বিশেষ করেছে পরিসংখ্যান—বিশ্বকাপ ফাইনালে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে জয়সূচক গোল করা ইতিহাসের দ্বিতীয় ফুটবলার তিনি। এর আগে কেবল জার্মানির মারিও গোটশে (২০১৪ ফাইনালে) এই কীর্তি গড়েছিলেন। শেষ বাঁশি বাজার পর সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যটি ছিল—লিওনেল মেসি যখন নিঃশব্দে হারের কষ্ট সইছিলেন, তখন সবার আগে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেন ফেরান তোরেস।

ইরান সরকারের পক্ষ থেকে স্পেনের এই বিশ্বকাপ জয়কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী শক্তির জয় হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে এবং এ জন্য স্পেনকে অভিনন্দন জানানো হয়েছে। তোরেসের জন্য অবশ্য ১৯ জুলাই শুধু বিশ্বকাপ জেতার দিন নয়, এটি তার পুনর্জন্মেরও দিন—যেখানে তিনি প্রমাণ করেছেন, তিনি সত্যিই ডুবে যেতে রাজি নন।