কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভবিষ্যতে অর্থনীতিতে কীভাবে প্রভাব ফেলবে, সে সম্পর্কে অর্থনীতির শীর্ষ বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও রয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। সম্প্রতি এক বিবৃতিতে দুই শতাধিক অর্থনীতিবিদ — যাদের মধ্যে ১৬ জন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রয়েছেন — স্বীকার করেছেন, এআই-এর অর্থনৈতিক পরিণতি বোঝার মতো পর্যাপ্ত জ্ঞান বা সরঞ্জাম তাদের নেই।
‘We Must Act Now’ শিরোনামের এই বিবৃতিটি গত সোমবার প্রকাশিত হয়। এতে তিনটি মূল সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, আগামী দশ বছরের মধ্যে এআই নাটকীয়ভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। দ্বিতীয়ত, এটি শিল্প বিপ্লবের চেয়েও বৃহত্তর অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম, কিন্তু সময়ের পরিধি হবে অনেক সংক্ষিপ্ত। তৃতীয়ত, এর ফলে চাকরির বাজারে ব্যাপক ধস নামার পাশাপাশি জীবনযাত্রার মানে বিরাট উন্নতির সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই অর্থনীতিবিদ, নীতি নির্ধারক ও প্রযুক্তি নেতাদের এখনই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, যাতে এআই-এর বিকাশ মানুষের উপকারে আসে এবং বিরূপ প্রভাব কমানো যায়।
ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক আন্তন কোরিনেক, যিনি বিবৃতিটির অন্যতম সংগঠক, বলেন, ‘আমরা কুয়াশার মধ্যে দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছি এবং পরবর্তী কী হবে তা অনুমান করা অত্যন্ত কঠিন।’ নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের নোবেলজয়ী অধ্যাপক মাইকেল স্পেন্স এআই-কে ‘মানবতার উপকারী দিকে পরিচালিত করতে’ সবার একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।
এই বিবৃতিটি একটি নীতি প্রস্তাব বা ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বরং পরিষ্কার দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়ার জন্য অবকাঠামো নির্মাণের দাবি। এমআইটির নোবেল বিজয়ী ড্যারন অ্যাসেমোগলু, যিনি এআই-এর উৎপাদনশীলতা সংক্রান্ত দাবির সবচেয়ে কঠোর সমালোচক, পাশাপাশি বিবৃতিতে স্বাক্ষর করে বলেন, ‘এআই-কে পুনর্নির্দেশের জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরায় নেতৃস্থানীয় বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগ দিতে পেরে আমি আনন্দিত।’
তবে সংশয়ও রয়েছে। অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ টরস্টেন স্লোক বিবৃতি প্রকাশের আগে এক ব্লগ পোস্টে দেখান, ‘এআই এক্সপোজার’ পরিমাপের পাঁচটি ভিন্ন কাঠামো বর্তমানে চালু আছে, যেগুলো ভিন্ন ভিন্ন ফল দেয়। কিছু কাঠামো তাত্ত্বিক সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা বাস্তব ব্যবহারের তুলনায় অনেক বেশি ‘এক্সপোজার’ দেখায়। স্লোকের মতে, কেউ যখন বলেন একটি পেশা ‘এআই-এর সংস্পর্শে বেশি’, তখন প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত: কোন মাপকাঠিতে? কী পরিমাপ করা হচ্ছে? এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না দিলে ‘এআই এক্সপোজার’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ থাকে খুবই সীমিত।
বিবৃতির আরেক সংগঠক স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এরিক ব্রিনজলফসন বলেন, ‘এআই সক্ষমতা অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে আমাদের বোধগম্যতার চেয়ে অনেক দ্রুত এগোচ্ছে।’ তিনি এআই-এর প্রভাব বোঝার জন্য ‘ক্যানারিজ ড্যাশবোর্ড’ নামে একটি সরঞ্জাম তৈরি করেছেন, যা ৭৩০টিরও বেশি পেশায় ৪৬ লাখ কর্মীর তথ্য বিশ্লেষণ করে। এই ড্যাশবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এআই-সম্পর্কিত পেশায় ২২ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ কর্মীদের চাকরি বছরে ৪ শতাংশের বেশি হ্রাস পাচ্ছে, যদিও সামগ্রিক শ্রমবাজার স্থিতিশীল দেখায়।
ব্রিনজলফসন আরও বলেন, ‘আমরা বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়ের দিকে অন্ধকারে উড়ে যাচ্ছি। আমাদের দরকার সময়োপযোগী ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, যা বুঝতে সাহায্য করবে কোথায় এআই মূল্য তৈরি করছে এবং কোথায় এটি কর্মসংস্থানে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।’
এদিকে একাধিক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এআই ও চাকরি সংক্রান্ত জনসমক্ষে বিতর্ক মূলত ‘অনুমান’-এর ওপর ভিত্তি করে। অ্যাডিপির প্রধান অর্থনীতিবিদ নেলা রিচার্ডসনও একই মত প্রকাশ করে বলেছেন, এআই ও কর্মসংস্থানের অগণিত চলকের কারণে প্রকৃত প্রভাব বোঝা কঠিন।
সবমিলিয়ে, অর্থনীতির সবচেয়ে বড় নামগুলি এক জায়গায় এসে স্বীকার করছে যে তারা মৌলিক একটি বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দিতে অক্ষম। তাদের আহ্বান, এখনই সময় সতর্কতার সঙ্গে এগোনোর, যাতে এআই-এর সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়িয়ে সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যায়।

