ব্রিটেনের খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপক হিসেবে পরিচিতি পাওয়া জেসন আরডে আর নেই। গতকাল দক্ষিণ লন্ডনের একটি ঠিকানায় ৪১ বছর বয়সী এই শিক্ষাবিদকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হলে পরবর্তীতে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং কেমব্রিজ কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিকভাবে মৃত্যুর কারণ হিসেবে আকস্মিক মৃত্যুকে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং এতে কোনো সন্দেহজনক দিক আছে বলে মনে করছে না পুলিশ। সেন্ট্রাল সাউথ কমান্ড ইউনিটের কর্মকর্তারা ঘটনাটি খতিয়ে দেখছেন।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি একাডেমিক গবেষণায় চুরির অভিযোগের জেরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন অধ্যাপক আরডে। এরই প্রেক্ষিতে গত ৫ আগস্ট তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদ এবং জেসাস কলেজের ফেলোশিপ উভয় পদ থেকে ইস্তফা দেন। তবে পদত্যাগের চিঠিতে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বীকৃতি হিসেবে এই পদত্যাগ নয়, বরং চলমান কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার একমাত্র পথ ছিল এটি। এই সিদ্ধান্তকে তিনি তাঁর কাজের সমাপ্তি বলেও মনে করেন না এবং সুস্থ হয়ে আবার ফিরে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ডেবোরা প্রেন্টিস এক বিবৃতিতে এই মর্মান্তিক খবরে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই কঠিন সময়ে আরডের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হচ্ছে। অন্যদিকে, সাইমন অ্যান্ড শুস্টার প্রকাশনীর মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে আরডের পরিবার জানিয়েছে, ‘মিথ্যা প্রচারণার কারণে জেসনের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কোমল ও সদালাপী মানুষ, যিনি সবার মধ্যে ভালো কিছু দেখতে পছন্দ করতেন।’ পরিবারটি আরও অভিযোগ করেছে যে, তাঁর একাডেমিক কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে একটি ‘হয়রানির প্রচারণা’ চালানো হয়েছিল।
ঘটনার সূত্রপাত মূলত গত বছরে। ২০২৩ সালে কেমব্রিজে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই কিছু শিক্ষাবিদ ও সংবাদমাধ্যম তাঁর পিএইচডি গবেষণাপত্রের কিছু অংশ অন্য উৎস থেকে হুবহু নকল করার অভিযোগ তোলে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের ‘দ্য টাইমস’ ও ‘টেলিগ্রাফ’ পত্রিকা তাঁর একাডেমিক কাজ ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এছাড়া গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাবিদ নাথান কফনাসের একটি লেখা প্রকাশের পর বিতর্ক আরও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। এর আগে বর্ণবাদী মন্তব্যের অভিযোগে কেমব্রিজের সঙ্গে কফনাসের গবেষণা চুক্তি বাতিল হয়েছিল। তিনি আরডের গবেষণাপত্রের একাধিক অংশ নকলের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তোলেন।
এছাড়া অধ্যাপক আরডের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছিল। দাবি করা হয়েছিল, তিনি মাত্র ৩৫ দিনে ৩০টি ম্যারাথন দৌড়েছেন এবং বিপুল অঙ্কের দাতব্য তহবিল সংগ্রহ করেছেন, যা নিয়ে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেন। মৃত্যুর আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে আরডে তাঁর গবেষণাকর্মে ভুল থাকার কথা স্বীকার করলেও নিজেকে ‘মিথ্যাবাদী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, কেমব্রিজে অধ্যাপনার সুযোগ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পেশাদার সাফল্য ছিল, কিন্তু এই নিয়োগের পর থেকেই তাঁকে জনসমক্ষে ক্রমাগত তীব্র সমালোচনা ও ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে। তিনি জানান, এই চাপ তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষতি ও মানসিক অসুস্থতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এদিকে যুক্তরাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী লুসি পাওয়েল জেসন আরডের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন এবং এই কঠিন সময়ে তাঁর পরিবারের গোপনীয়তা রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, মন্তব্য করার সময় যেন মনে রাখা হয় যে এর পেছনে একটি শোকাহত পরিবার রয়েছে। লন্ডন অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের তথ্যের ভিত্তিতে শহরের ব্যাটারসি এলাকার একটি বাড়ি থেকে একজনকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল বলেও পুলিশের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে।




