বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এখন আর প্রচলিত উন্নয়ন সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা আরও বিস্তৃত ও কৌশলগত একটি মাত্রা লাভ করেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঢাকার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, কূটনৈতিক পর্যায়ে অর্জিত এই আস্থা ও সমঝোতাগুলোকে মূর্ত ফলাফলে রূপান্তরিত করা এবং একইসাথে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ন রাখা। রোববার সকালে রাজধানীর নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্স (এসআইপিজি) আয়োজিত এক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা এই অভিমত ব্যক্ত করেন।

‘বাংলাদেশ-চীন রিলেশনস: এনহ্যান্সড ট্রাস্ট অ্যান্ড নিউ ডিরেকশনস’ শীর্ষক এই আলোচনা সভার কেন্দ্রবিন্দু ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বেইজিং সফর। সফরপরবর্তী কূটনৈতিক গতি ও আস্থার এই নয়া অধ্যায় কী করে কূটনীতি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে, সেমিনারে তা বিশ্লেষণ করা হয়। বক্তাগণ জোর দিয়ে বলেন, দ্রুত বদলে যাওয়া আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সতর্কতার সাথে তাল মিলিয়ে পারস্পরিক সুবিধার শর্তে সব রাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতা চালাতে বাংলাদেশকে উন্মুক্ত মনোভাব বজায় রাখতে হবে।

প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর মন্তব্য করেন, যে কোনো অংশীদারিত্ব তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা জাতীয় অগ্রাধিকারকে সমৃদ্ধ করে। তাঁর ভাষ্য মতে, প্রতিটি সহযোগিতার মূলে থাকতে হবে বাংলাদেশের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও জনসাধারণের কল্যাণের ধারণা। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিমন্ত্রকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিজস্ব সক্ষমতায় উন্নয়নযাত্রা এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশের নিজেকেই গ্রহণ করতে হবে এবং চীনের সাথে সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে পরস্পরের প্রতি সম্মান, জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব। তিনি বহুমুখী পরিবহন কাঠামো, চট্টগ্রামের চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ এবং প্রস্তাবিত কুনমিং-চট্টগ্রাম সংযোগে চীনা সহযোগিতাকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যকার গণমুখী সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান আরও গভীর করার ওপরও তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন।

পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন চুক্তি, প্রটোকল, গণমাধ্যম পর্যায়ের সহযোগিতা এবং কৃষি, পানি নিরাপত্তা, সরবরাহ চেইন, প্রযুক্তি ও বহুপক্ষীয় ফোরামে যৌথ কাজের মাধ্যমে সম্পর্ক এগিয়েছে। তবে বর্তমানে সবচেয়ে জরুরি কর্তব্য হলো প্রতিশ্রুতি ও বিনিয়োগগুলোকে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও দেশের জাতীয় স্বার্থের সাথে সংগতি রেখে উচ্চ প্রভাব সৃষ্টিকারী প্রকল্পে পরিণত করা।

ঢাকাস্থ চীন দূতাবাসের কালচারাল কাউন্সিলর লি শাওপেং তার বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে দু’দেশের সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনাকার হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ভৌত অবকাঠামো নয়, বরং মানবিক সম্পর্কই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি জনগণের সাথে জনগণ-সংযোগকে ভৌত সংযোগ থেকে অধিক তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরে তিনি রাজনৈতিক আস্থা, আন্তর্জাতিক সমন্বয় ও অভিন্ন উন্নয়নের ধারণাকে বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার কেন্দ্রীয় ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন কালে এসআইপিজি্র জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো মোহাম্মদ সুরিফর রহমান বলেন, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে শুধু একক প্রকল্পের নিরিখে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলী পরিকল্পনার কাঠামোতে মূল্যায়ন করতে হবে। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, টেকসই সহযোগিতার ভিত্তি শুধুমাত্র স্বল্পমেয়াদি আর্থিক স্বার্থের উপর দাঁড়াতে পারে না; বরং ভূর-অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, সংযোগ ও পারস্পরিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোকে ভবিষ্যতের অংশীদারত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। তিনি তাঁর প্রবন্ধে বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার করিডোর, তিস্তা ও উত্তরাঞ্চলের নদী ব্যবস্থাপনা, রোহিঙ্গা সংকট, মিয়ানমারের অস্থিরতা, বঙ্গোপসাগরীয় ভূরাজনীতি এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নিয়েও আলোচনায় আনেন। পাশাপাশি, যেকোনো একক অংশীদারের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা পরিহারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি।

সেমিনারে মুখ্য আলোচক হিসেবে অংশ নেন চীনের সাংহাই ইনস্টিটিউটস ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (এসআইআইএস) সেন্টার ফর সাউথ এশিয়া স্টাডিজের পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো লিউ জংই। এসআইপিজির পরিচালক অধ্যাপক তৌফিক এম হকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে আরও বক্তব্য রাখেন এনএসইউর বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য বেনজির আহমেদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী।