ভারতে তরুণ প্রজন্মের ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। গতকাল শনিবার তাঁর এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবি পূরণ হয়েছে। আন্দোলনটির নেতৃত্ব দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি), যা মূলত একটি অনলাইনভিত্তিক উদ্যোগ, কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দল নয়। গত মে মাসে ইনস্টাগ্রামে যাত্রা শুরু করা এই গ্রুপটি মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ২ কোটি ২০ লাখের বেশি অনুসারী অর্জন করে, যাদের অধিকাংশই জেন-জি প্রজন্মের তরুণ।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় নিট-ইউজি পরীক্ষা বাতিলের প্রতিবাদে জুন মাস থেকে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ শুরু হয়। ২০ জুলাই শিক্ষার্থীরা ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচি পালন করতে গেলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। পুলিশ লাঠিপেটা ও টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে এবং কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করে। এই সহিংসতার পর আন্দোলন আরও তীব্র হয় এবং বিহার, পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষণা আসে, যা বিক্ষোভকারীদের জন্য একটি বড় সাফল্য।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য একটি বিরল রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মোদিকেন্দ্রিক রাজনীতিতে এত বড় মাত্রার তরুণ বিক্ষোভ দেখা যায়নি। লন্ডনের এসওএসএস বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সঞ্জয় শ্রীবাস্তব বলেন, এই বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেকেই হয়তো মোদির সমর্থক ছিলেন, যা আগের বিক্ষোভ থেকে ভিন্ন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এখন বড় সংখ্যক মানুষ সরকারকে প্রশ্ন করতে শুরু করেছে এবং ‘ক্ষমতাসীন দল দেশের জন্য ভালো’—এই ধারণা দুর্বল হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অমিতাভ তিওয়ারির মতে, প্রশ্নপত্র ফাঁস ছিল আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণ, কিন্তু এর পেছনে তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের উদ্বেগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরি হারানোর ভয়ও কাজ করেছে। তিনি আরও বলেন, ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে, কিন্তু লোকসভায় তাদের প্রতিনিধিত্ব মাত্র ১০ শতাংশ। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার গড় বয়স ৬০ বছরের বেশি, যা তরুণদের প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি নির্দেশ করে।
বিরোধী দলগুলো এই বিক্ষোভকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। আগামী বছর উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব এবং মোদির নিজ রাজ্য গুজরাটে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই তিন রাজ্যই বর্তমানে বিজেপিশাসিত, তবে তরুণদের ক্ষোভ বিজেপির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তামিলনাড়ুতে সম্প্রতি চলচ্চিত্র অভিনেতা চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয় (থালাপতি বিজয়) তার দল গঠন করে এবং জেন-জি ভোটারদের সমর্থনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে মুখ্যমন্ত্রী হন। বিশ্লেষকদের ধারণা, অনুরূপ ঘটনা ভবিষ্যতে অন্যান্য রাজ্যেও ঘটতে পারে।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপ অবশ্য বলেছেন, নির্বাচনী রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি সিজেপি রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হয়, তাহলে ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে মোদির জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বিজেপির ইনস্টাগ্রামে অনুসারী সংখ্যা মাত্র ১ কোটি, যেখানে সিজেপি মাত্র কয়েক দিনে তার দ্বিগুণের বেশি অনুসারী পেয়েছে। কলাম লেখক সন্তোষ দেশাই বলেন, ইনস্টাগ্রামে নিজস্বতা ও সত্যিকারের ভাবমূর্তি প্রয়োজন, যা এই প্রজন্মের মধ্যে অন্ধ শ্রদ্ধা তৈরি করে না। এই আন্দোলন দেখিয়েছে যে মোদি সরকারকে তরুণদের কথা শুনতে হবে এবং তাদের উদ্বেগের সমাধান করতে হবে। মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্য রাজনাথ সিং বলেছেন, সরকার শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ বোঝার চেষ্টা করছে এবং দ্রুত সমাধান দিতে চায়।
এই আন্দোলন ২০২১ সালে কৃষি আইন বাতিলের আন্দোলনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ, তবে অনেক দ্রুত সফল হয়েছে। তখন কৃষকদের এক বছর লেগেছিল, কিন্তু এবার ৩৬ দিনেই শিক্ষার্থীরা তাদের লক্ষ্যে পৌঁছেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে তরুণ প্রজন্মের সম্মিলিত শক্তি আগের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।




