বন্ধুর হাতে নতুন ফোন দেখে নিজেরটা পুরোনো মনে হওয়া, কঠিন অঙ্ক বুঝে উঠতে না পারা, অথচ পাশেরজন সহজেই বুঝে ফেলছে—এমন অসংখ্য অভিযোগ ছোটদের মুখে শোনা যায়। বৃষ্টির কারণে বাইরে যাওয়া মাটি হয়ে যাওয়া কিংবা পরীক্ষায় খারাপ ফল—প্রতিদিনই কোনো না কোনো কারণে শিশুদের মনে হতাশা কাজ করে। অভিভাবকদের কাছে এসব দৃশ্য বেশ পরিচিত হলেও সন্তানের মুখে এসব কথা শুনে সাধারণত আমরা দুটো পথের যেকোনো একটি বেছে নিই—হয় তাকে সান্ত্বনা দিই, নয়তো বিরক্ত হয়ে বলি 'এত ঘ্যানঘ্যান করো কেন?' কিন্তু এই দুই প্রতিক্রিয়ার মাঝামাঝি রয়েছে আরেকটি কৌশল, যা সমস্যাটিকে অস্বীকার না করে সন্তানকে সমাধানের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

প্রশ্নটি অত্যন্ত সহজ: 'ঠিক আছে, এখন তুমি কী করতে পারো?' অনলাইনে প্রচলিত একটি গল্পে এক বাবার কথা বলা হয়েছে, যিনি তাঁর তিন ছেলেকে বড় করে তুলেছিলেন সফল মানুষ হিসেবে। সাফল্যের রহস্য জানতে চাইলে তিনি জানিয়েছিলেন, ছেলেরা যখনই কোনো সমস্যার কথা বলতেন, তিনি তর্ক না করে কেবল জিজ্ঞেস করতেন, 'এখন তুমি কী করতে পারো?' যদিও গল্পটির সত্যতা যাচাই করা যায়নি এবং পরিবারটির পরিচয়ও নিশ্চিত নয়, তথাপি এর ভেতরে থাকা সন্তান প্রতিপালনের ধারণাটিই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রতিটি সমস্যার সমাধান করে দেওয়া যেমন সন্তানকে পরনির্ভরশীল করে তুলতে পারে, তেমনি তার অনুভূতিকে একেবারে উপেক্ষা করাও কাম্য নয়।

শুরুতে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন যে, সন্তানের মুখে কোনো কষ্টের কথা শুনলেই তাকে 'অভিযোগ' আখ্যা দিয়ে থামিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। 'আমার বন্ধু আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে', 'স্কুলে আমাকে কেউ মেরেছে' অথবা 'পড়ার চাপ সামলাতে পারছি না'—এ জাতীয় উক্তিগুলো নিছক অভিযোগ নয়, এগুলো বাস্তব সমস্যাও হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রথম করণীয় হলো মন দিয়ে শোনা, অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও সহায়তা নিশ্চিত করা। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, হতাশাজনক মুহূর্তে মা–বাবার কাছ থেকে আবেগগত স্বীকৃতি পেলে ছোট শিশুদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ 'মন খারাপ করার কিছু নেই' বলার চেয়ে 'বুঝতে পারছি, এটা আসলেই কঠিন' বলাটি অনেক বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সন্তানের অভিযোগ বন্ধ করা নয়, বরং অভিযোগের পরবর্তী চিন্তাটিকে পুনর্গঠন করা।

উদাহরণস্বরূপ, সন্তান যদি বলে 'অঙ্কটাই বুঝতে পারছি না', তখন 'অঙ্ক তো কঠিন নয়, বুঝে করলেই হবে'-এই ধরনের উত্তর না দিয়ে বলা যেতে পারে, 'কোন অংশটা বুঝতে সমস্যা হচ্ছে? চলো না, সমস্যাটা কোথায় দেখি।' আবার কারও ভালো ফোন দেখে সন্তান আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলে 'তোমার আবার এত ফোনের দরকার কী?' না বলে জিজ্ঞেস করা যায়, 'তোমার মনে হচ্ছে কেন ওই ফোনটা দরকার? আর সেটা পেতে হলে কী কী করা যায়?' পরীক্ষায় খারাপ ফল এলে 'আগেই তো বলেছিলাম!' বলার পরিবর্তে প্রশ্ন হতে পারে, 'কোন অংশে ভুল হয়েছিল? পরেরবার কোন জায়গাটায় একটু ভিন্নভাবে প্রস্তুতি নিতে পারো?' এ ধরনের প্রশ্নের মাধ্যমেই ধীরে ধীরে সন্তান শিখে যায় কীভাবে সমস্যাকে নিছক দুর্ভাগ্য না ভেবে নিজের করণীয় খুঁজে বের করতে হয়।

তবে সন্তানকে সমস্যা সমাধানে শেখাতে গিয়ে অনেক অভিভাবক 'তোমার সমস্যা, তুমিই সামলাও'-এই ভুলটা করে থাকেন, যা আসলে কাম্য নয়। সন্তানের বয়স ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সহায়তার মাত্রা নির্ধারণ করতে হবে—কোনো সমস্যার সমাধান সে নিজেই করতে পারবে, কোনো ক্ষেত্রে অভিভাবকের পরামর্শ লাগবে, আবার কোনো পরিস্থিতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনও শিশুদের মধ্যে 'রেজিলিয়েন্স' বা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়ানোর দক্ষতা তৈরিতে সংযোগ, সহায়তা এবং সমস্যা মোকাবিলার দক্ষতার ওপর জোর দিচ্ছে। রেজিলিয়েন্সের অর্থ এই নয় যে শিশুরা কখনো কষ্ট পাবে না; বরং কষ্টের মধ্য দিয়েও ধীরে ধীরে মোকাবিলা করার ক্ষমতা গড়ে তোলাই এর মূল উদ্দেশ্য।

সন্তানের জুতার ফিতা বাঁধা থেকে শুরু করে স্কুলের প্রজেক্ট কিংবা বন্ধুর সঙ্গে মনোমালিন্য—সব সমস্যার সমাধান যদি মা–বাবা নিজেরাই করে দেন, তাহলে সন্তান হয়তো মুহূর্তের জন্য স্বস্তি পায়, কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তার মধ্যে বিকশিত হয় না। তাই বয়স-উপযোগী সমস্যাগুলোতে সন্তানকে একটু সময় দিয়ে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে, 'কাজটা শেষ করতে প্রথমে কী কী করা যায়?' অথবা বন্ধুর সঙ্গে ঝামেলার প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা যেতে পারে, 'তুমি কি তার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছ?' প্রথমবার হয়তো উত্তর জানবে না, কিন্তু বারবার এ ধরনের প্রশ্নই সন্তানকে নিজের চিন্তা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

এছাড়া শিশুরা আমাদের কথা শোনে তো বটেই, সাথে সাথে আমাদের আচরণ থেকেও অনেক কিছু শিক্ষা নেয়। রাস্তাঘাটের খোঁড়াখুঁড়ি দেখে বাবা যদি সারাক্ষণ হতাশা প্রকাশ করেন, তবে সন্তানও সমস্যাকে কেবল বিরক্তির কারণ হিসেবে দেখতে শিখবে। অন্যদিকে একই পরিস্থিতিতে বাবা যদি বলেন 'রাস্তায় কাজ চলছে, অন্য পথে ঘুরে যেতে হবে', তাহলে সন্তান সমস্যার সমাধানমুখী একটি দৃষ্টিভঙ্গি দেখতে পাবে। অর্থাৎ সন্তানকে সমাধানমুখী করে তোলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নিজেদের আচরণেও সেই প্রতিফলন ঘটানো।

অবশ্যই একটি প্রশ্নে রাতারাতি কোনো সন্তানের মানসিকতা বদলে যাবে না, সব সমস্যার সমাধানও সম্ভব নয়। কিন্তু বারবার একই ধরনের প্রশ্নের মাধ্যমে সন্তান একটি নতুন অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে। জীবনের সবকিছু তো আর নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না—পরীক্ষার প্রশ্ন কঠিন আসতে পারে, হঠাৎ বৃষ্টি নামতে পারে, প্রিয় বন্ধু হয়তো অন্য কারও সঙ্গে সময় কাটাবে, কিংবা কোনো পরিকল্পনা ব্যর্থও হতে পারে। সবকিছু বদলানো সম্ভব নয় বটে, কিন্তু পরিস্থিতির পরে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সন্তানকে সফল করার কোনো জাদুর ফর্মুলা না থাকলেও তাকে এমনভাবে বড় করা যায় যাতে ব্যর্থতা তাকে থামাতে না পারে এবং সমস্যা তাকে অসহায় করে না ফেলে। তাই সবার আগে শুনুন, তারপর অনুভূতিকে স্বীকার করুন—'তোমার খারাপ লাগাটাই স্বাভাবিক।' এরপর পরিস্থিতি বুঝে প্রশ্ন করুন, 'এখন কী করা যায়?' প্রয়ােজনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন, তবে এমন নয় যেন প্রতিটি সমস্যার সমাধান মা–বাবাকেই করতে হয়। এভাবেই সন্তান শিখতে পারবে কঠিন পরিস্থিতিতেও ভাবতে—'ঠিক আছে, এখন আমার পরবর্তী পদক্ষেপ কী?' হয়তো জীবনের সব সমস্যার সমাধান তখনও হবে না, কিন্তু সে সমস্যার সামনে দাঁড়িয়ে না থেকে এগিয়ে যাওয়ার অভ্যাসটি রপ্ত করতে শুরু করবে, যা হয়তো একদিন তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে উঠবে।