সিয়াটলে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের রাউন্ড অফ ১৬-এর ম্যাচে বেলজিয়ামের কাছে ৪-১ গোলে হেরেছে যুক্তরাষ্ট্র পুরুষ জাতীয় ফুটবল দল। তবে এই পরাজয়ের মধ্য দিয়েই ইতিহাস গড়েছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দর্শক দেখা ফুটবল সম্প্রচারের নজির তৈরি হয়েছে এই ম্যাচটি। ফক্স স্পোর্টসের তথ্যমতে, রাত ৯টা ১৫ মিনিট থেকে ৯টা ৩০ মিনিটের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩ কোটি ৬৮ লাখ দর্শক এই খেলা উপভোগ করেছেন। মোট দর্শক সংখ্যা ছিল ৩ কোটি, যা আগের সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র-বসনিয়া ম্যাচের ২ কোটি ৬৪ লাখ দর্শকের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।

দর্শকদের এই ব্যাপক সমর্থনের পেছনে রয়েছেন ধনকুবের বিনিয়োগকারী কেন গ্রিফিন। সিটাডেল হেজ ফান্ডের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী গ্রিফিন নিজেকে ফুটবল পাগল হিসেবে পরিচিত করেন। মার্কিন দলের জন্য কোচ মরিসিও পোচেত্তিনোকে নিয়ে আসার পেছনে তার সরাসরি ভূমিকা ছিল। পোচেত্তিনোর নেতৃত্বেই ২৪ বছর পর (এবং দলের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো) যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ জয় করতে সক্ষম হয়েছে। গ্রিফিন ফরচুনকে বলেন, 'মরিসিওর নেতৃত্বে মার্কিন দলের অগ্রগতি এবং বিশ্বকাপের আবেগ আমেরিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে দেখে আমি আনন্দিত। আগামী বছরগুলোতে এই গতি ধরে রাখার অপেক্ষায় রয়েছি।'

গ্রিফিনের ফুটবলপ্রেম শৈশব থেকেই। ৬ বছর বয়সে খেলা শুরু করা এই বিনিয়োগকারী ফ্লোরিডার হাইস্কুল দলে রাজ্য রানার্সআপ হয়েছিলেন। পরবর্তী জীবনে নিজের সন্তানদের দলের কোচিং পর্যন্ত করেছেন। এই ব্যক্তিগত সম্পর্কই ফুটবলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি দানকার্যে রূপ নিয়েছে। মোট প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার দান করেছেন গ্রিফিন, যার মধ্যে সম্প্রতি থিওডোর রুজভেল্ট প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরির জন্য ২৬ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন দেশের ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে। ফুটবলের জন্য ২০১৭ সালে শিকাগোতে ৫০টি মিনি-পিচ নির্মাণে ৩ মিলিয়ন ডলার দেন, যেখানে তখন সিটাডেলের সদর দপ্তর ছিল। ২০২৩ সালে মিয়ামি-ডেড কাউন্টিতে আরও ৫০টি মিনি-পিচের জন্য ৫ মিলিয়ন ডলার দেন। মোট ১০০টি মিনি-পিচ সুবিধাবঞ্চিত এলাকার ১ লাখের বেশি শিশু ও পরিবারের জন্য নিরাপদ খেলার জায়গা তৈরি করে দিয়েছে। এজন্য ইউএস সকার ফাউন্ডেশন তাকে 'সবচেয়ে প্রভাবশালী দানশীল' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে #১০ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে।

পোচেত্তিনো নিয়োগের প্রক্রিয়াটি শুরু হয় ডায়ামিটার ক্যাপিটাল পার্টনার্সের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্কট গুডউইনের একটি টেক্সট বার্তার মাধ্যমে। গুডউইন ইউএস সকারের প্রধান নির্বাহী জেটি ব্যাটসনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন যে শীর্ষস্থানীয় কোচদের বেতন বহন করা ফেডারেশনের পক্ষে সম্ভব নয়। তখন তিনি গ্রিফিনের শরণাপন্ন হন। ইউএস সকার সরাসরি সরকারি তহবিল পায় না; গত বছর ২৬৪ মিলিয়ন ডলার আয়ের মধ্যে ৫০ মিলিয়ন দান থেকে এসেছে, যার অধিকাংশই নির্দিষ্ট খাতে ব্যয়বহির্ভূত। গ্রিফিনের অবদানই পোচেত্তিনোর চুক্তি সম্ভব করে তোলে, যা অন্যথায় নাগালের বাইরে ছিল। রিউটার্সের খবরে বলা হয়, গ্রিফিনের অবদানই ছিল একদল দানশীলের মধ্যে সবচেয়ে বড় আর্থিক অংশ।

পোচেত্তিনো, যিনি পূর্বে টটেনহাম হটস্পার, প্যারিস সেন্ট-জার্মেই ও চেলসি পরিচালনা করেছিলেন, তিনি দুই বছরের চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র দলের পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেন। ইউএস সকারের ইতিহাসে তিনিই সবচেয়ে বেশি বেতন পাওয়া কোচ, যার বার্ষিক বেতন প্রায় ৬ মিলিয়ন ডলার। কর নথি অনুসারে, প্রথম ৭ মাসে তিনি সাইনিং বোনাস ২.৫ মিলিয়ন ডলারসহ মোট ৫ মিলিয়নের বেশি ডলার পেয়েছেন।

মাঠের পারফরম্যান্সেও ফল মিলেছে। সম্প্রসারিত ৪৮ দলের বিশ্বকাপে ৩২ দলের পর্বে খেলে যুক্তরাষ্ট্র প্যারাগুয়েকে ৪-১, অস্ট্রেলিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ শীর্ষে উঠে, তুরস্কের কাছে ৩-২ হারলেও। রাউন্ড অফ ৩২-এ বসনিয়াকে ২-০ গোলে হারানো ম্যাচে স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের বিতর্কিত লাল কার্ড ফিফা পরে নাকচ করে দেয়।

গ্রিফিনের উদ্যোগ শুধু মাঠের বাইরেও সীমাবদ্ধ নয়। গ্রিফিন ক্যাটালিস্ট মিয়ামির মিনি-পিচগুলোতে অলাভজনক সংস্থার মাধ্যমে গণদর্শনের আয়োজন করেছে, যেখানে ম্যাচ সম্প্রচার, ফুটবল কার্যক্রম, সংগীত ও খাবারের ব্যবস্থা ছিল। প্রতিষ্ঠানটি মিয়ামি বিশ্বকাপ ২০২৬ আয়োজক শহরের অফিসিয়াল সমর্থক এবং ফিফা ফ্যান ফেস্টিভ্যালের স্পন্সর। গ্রিফিন ও মিয়ামি ডলফিনসের মালিক স্টিফেন রস মিলে বয়েজ অ্যান্ড গার্লস ক্লাবের যুবকদের জন্য ১২০০-এর বেশি বিশ্বকাপ টিকিট দান করেছেন।

ম্যাচের আগে রিউটার্সকে গ্রিফিন বলেন, আমেরিকায় বিশ্বকাপ আয়োজন সত্যিই বিশেষ একটি অভিজ্ঞতা। তিনি পিতৃ দিবসে মায়ামিতে উরুগুয়ে-কেপ ভার্দে ম্যাচ দেখার কথাও উল্লেখ করেন।