দুই বছর আগেও ঢাকার ব্যস্ত সড়কে গাড়ি চালাতেন মিজানুর রহমান। তখন মাস শেষে আয় হতো ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা। এখন সেই আয় কমে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার টাকায়, যা পুরোটাই সরকারি ভাতার ওপর নির্ভরশীল। চিকিৎসকের কাছে যাওয়া আর বাড়ির সামনে হাঁটাচলা ছাড়া তার আর তেমন কিছু করার নেই। শহরে আসতে হলে সঙ্গী প্রয়োজন হয়। বর্তমানে তিনি লালমনিরহাটের সদর উপজেলার হারাটি ইউনিয়নের ঢাকনাই কুড়ারপাড়া গ্রামে মা-বাবা ও স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বসবাস করছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিকেলে আনন্দমিছিলে অংশ নিতে গিয়ে মিরপুর মডেল থানার সামনে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। ওই ঘটনার বর্ণনায় মিজানুর জানান, থানার বন্ধ ফটকে লোকজন ধাক্কা দিতে শুরু করলে ছাদ থেকে ব্যাপক গুলি চলে। তিনি দৌড়ে একটি গাছের আড়ালে আশ্রয় নেন। হঠাৎ টের পান তার মাথা ও চোখ রক্তে ভেসে যাচ্ছে, কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। আর্তনাদ করলেও প্রাণভয়ে ছুটে চলা লোকজন সাড়া দিচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত দুই শিক্ষার্থীর টি-শার্ট ধরে সাহায্য চান তিনি। ওই তরুণেরা তাকে রিকশায় করে প্রথমে আলোক হাসপাতালে, পরে দারুস সালাম গ্রিন ডেলটা হাসপাতালে এবং শেষ পর্যন্ত আগারগাঁওয়ের জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে তার স্ত্রী ও গাড়ির মালিককে খবর দেওয়া হয়।
চিকিৎসার অংশ হিসেবে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) এবং দুই চক্ষু হাসপাতালে তার দুই চোখে মোট পাঁচটি অস্ত্রোপচার হয়েছে। বাঁ চোখে তিনটি ও ডান চোখে দুটি। তিনি জানান, ডান চোখে কিছুই দেখতে পান না। বাঁ চোখে মাত্র ২৩ থেকে ২৭ শতাংশ দৃষ্টি আছে, তাও ঝাপসা। প্রতি চার মাস অন্তর ঢাকায় চোখ পরীক্ষা করাতে যেতে হয়। চোখ না দেখার কারণে তার জীবন এখন সম্পূর্ণ অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
সরকারিভাবে তিনি 'ক' শ্রেণিভুক্ত আহত যোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এই শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যারা ন্যূনতম এক চোখ বা হাত বা পা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্বাধীনভাবে জীবনযাপনে অক্ষম। এ শ্রেণির ভাতা মাসে ২০ হাজার টাকা। অথচ শুধু ওষুধের পেছনেই মাসে দুই হাজার টাকার বেশি খরচ হয়। ঢাকায় চিকিৎসার জন্য গেলে ভ্রমণ ও থাকার খরচ যোগ হয়। 'খ' শ্রেণিভুক্তরা পান ১৫ হাজার এবং 'গ' শ্রেণিভুক্তরা পান ১০ হাজার টাকা।
সরকারের অনুদান ও বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় তিনি মোট ১১ লাখ টাকা পেয়েছিলেন। সেই টাকার বড় অংশ খরচ হয়ে গেছে। এক বছর আগে আড়াই লাখ টাকায় ১৭ শতকের ওপর একটি সুপারিবাগান বন্ধক নিয়েছেন। আর ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকায় তিনটি গরু কিনেছেন। সুপারিবাগান থেকে বছরে ১৩ হাজার টাকা আয় হলেও গরু থেকে এখনো কোনো আয় আসেনি, বরং খাদ্য ও পরিচর্যায় মাসে ১০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। এসব কাজের দায়িত্ব এখন তার স্ত্রী মোসা. নুরজাহান বেগমের ওপর বর্তেছে। অতিরিক্ত কাজের চাপে স্ত্রীও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
মিজানুরের বাবা আলতাফ হোসেন বলেন, ছেলের এই অবস্থায় তার খুব কষ্ট হয়। নিজের কোনো সামর্থ্য নেই যে তাকে সাহায্য করবেন। মিজানুরের মা-বাবার বয়স যথাক্রমে ৬৫ ও ৫৫ বছর। বাবা বর্গা চাষি। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে মিজানুর সবার বড়। অন্য ভাইয়েরা ঢাকার আশুলিয়ায় পোশাক কারখানায় চাকরি করেন।
জীবনের এই সংকটময় মুহূর্তে তিনি দুই ধরনের মানুষের দেখা পেয়েছেন—একজন দরদি, অন্যজন সুযোগসন্ধানী। হাসপাতালে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার সময় এক ব্যক্তি তার পকেট থেকে মুঠোফোন ও মানিব্যাগ চুরির চেষ্টা করেছিল। তা রক্ষায় তিনি হাত দিয়ে পকেট চেপে শুয়েছিলেন। কিন্তু সব ছাপিয়ে তার মন জুড়ে রয়েছেন উদ্ধারকারী সেই দুই তরুণ। হাসপাতালে ভর্তি করার পর তাদের মুঠোফোন নম্বর নেওয়া হয়নি বলে এখন তাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। মিজানুর আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, "ওদের দেখতে খুব ইচ্ছা হয়। একবার যদি দেখতে পারতাম! ওদের সঙ্গে দেখা হলে জড়িয়ে ধরতাম!"




