জাহেরা বেগমের জীবনে পদ্মা নদী কখনোই সহজ ছিল না। পঞ্চান্ন বছরের এই নারী আগেও তিনবার নৌকাডুবির মুখোমুখি হয়েছিলেন। তবে শেষবারের মতো তাঁর চোখের সামনে ডুবে গেলেন স্বামী ও সন্তান। মঙ্গলবার দুপুরের ঘটনা। রাজশাহীর কাটাখালী থানার শ্যামপুর বালুঘাট এলাকায় পদ্মা নদীর বুকেই ঘটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। ঝাউগাছ কাটার জন্য একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে চরে গিয়েছিলেন কাওসার আলী (৬০), তাঁর স্ত্রী জাহেরা ও ছেলে জিয়ারুল ইসলাম (৩০)। নৌকায় তাঁদের সঙ্গে আরও কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা ছিলেন। গাছ বোঝাই করে ফেরার পথে নদী ছিল উত্তাল। হঠাৎ করেই নিয়ন্ত্রণ হারায় নৌকাটি। বড়কুঠির সামনে মাঝনদীতে এসে সেটি ডুবে যায়। সেই মুহূর্তে সাঁতার দিয়ে তীরে উঠতে সক্ষম হন জাহেরা ও অন্য পাঁচজন। তবে আর ফিরে আসেননি মাঝি কাওসার আলী ও তাঁর পুত্র জিয়ারুল। ঘটনার পর থেকেই তাঁদের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। আজ বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্তও উদ্ধার কাজে সফলতা মেলেনি বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের রাজশাহী সদর স্টেশনের উপপরিচালক মনজিল হক। তিনি বলেন, রাজশাহী থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে নজরদারি চলছে। লাশ ভেসে উঠলেই দ্রুত উদ্ধার করা হবে। এদিকে স্বামী ও সন্তানের লাশের আশায় পদ্মাপাড়ে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন জাহেরা বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বারবার বলছেন, ‘আমিই বাঁচলাম, আমার স্বামী আর ছেলেকে হারালাম। নদী কেন আমাকে নিল না?’ তাঁর বাড়ি নদীর পাড়েই। বছর দশেক আগে নদীভাঙনের শিকার হয়ে ভারতীয় সীমান্ত লাগোয়া চর খিদিরপুর থেকে এপারে উঠে আসেন তাঁরা। নদীই ছিল তাঁদের জীবিকা। পানের বরজে ঝাউগাছের চাহিদা থাকায় চর থেকে গাছ কেটে এনে চারঘাটে বিক্রি করতেন কাওসার আলী। এ কাজের জন্যই বছরখানেক আগে একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা কিস্তিতে ঋণ নিয়ে নৌকাটি তৈরি করেছিলেন তিনি। প্রতি সপ্তাহে আড়াই হাজার টাকা কিস্তি দিতে হতো। এখন নৌকা তো গেছে, তার ওপর হারিয়েছেন স্বামী ও সন্তান। ঋণের বোঝা কিভাবে শোধ করবেন, তা ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছেন না জাহেরা। তাঁর কাছে বেঁচে থাকাটাই এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাহেরার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, জিয়ারুলের স্ত্রী সায়েরা খাতুন দুই সন্তান তামিম (১১) ও তাসমিরাকে (৭) নিয়ে বসে আছেন। একসঙ্গে বাবা ও দাদাকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছে শিশু দুটি। কান্নায় ভেঙে পড়া সায়েরা বলেন, ‘আমার স্বামী ও শ্বশুর চলে গেছেন। উপার্জনের কেউ রইল না। সরকার যেন আমাদের প্রতি সদয় হয়। আমরা বাঁচতে চাই।’ তিনি তাঁর স্বামী ও শ্বশুরের লাশ অন্তত উদ্ধার করে দেওয়ার আকুতি জানিয়েছেন। শেষবারের মতো একবার দেখে গোসল করিয়ে কবর দিতে চান তিনি। দ্রুত লাশ উদ্ধারের জন্যই দোয়া করছেন জাহেরা বেগম। নদীপাড়ে বসে বারবার হাত তুলে তিনি বলছেন, ‘আমাকে রেখে কেন আমার স্বামী ও ছেলেকে নিলে? পুত্রবধূকে নিয়ে আমার সংসার এখন কিভাবে চলবে?’ তাঁর কান্না যেন থামছেই না।
ঋণ করে কেনা নৌকা ডুবে রাজশাহীতে স্বামী-সন্তান নিখোঁজ, বেঁচে ফিরলেন জাহেরা
পদ্মা নদীতে নৌকাডুবিতে রাজশাহীর জাহেরা বেগমের স্বামী ও ছেলে নিখোঁজ। ঋণ করে কেনা নৌকায় ঝাউগাছ আনতে গিয়ে দুর্ঘটনা। সাঁতার কেটে বাঁচলেও পরিবারজনের সন্ধান মেলেনি। ঋণের বোঝা ও শোক কাঁধে নিয়ে নদীপাড়ে বসে আছেন তিনি।




