১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিক। অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি জার্মানি বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছিল আর্য জাতির শ্রেষ্ঠত্ব। কিন্তু সেই প্রচেষ্টাকে ধুলিস্মাৎ করে দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীড়াবিদ জেমস ক্লিভল্যান্ড ওয়েন্স, যিনি জেসি ওয়েন্স নামেই বেশি পরিচিত। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের চারটি ইভেন্টে সোনা জিতে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেন, যা তখন পর্যন্ত কোনো অ্যাথলেটের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
অলিম্পিক শুরুর আগেই অবশ্য ওয়েন্সকে নানা বাধা পেরোতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে তখন বর্ণবৈষম্য চরমে। ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের প্রিমিয়ার অ্যাথলেট হয়েও তিনি পাননি কোনো স্কলারশিপ। পড়াশোনার খরচ চালাতে গ্যাস পাম্পে কাজ, লিফট অপারেটর, এমনকি ওয়েটারের কাজও করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের দলের অধিনায়ক হয়েও ক্যাম্পাসে থাকার সুযোগ পাননি। শ্বেতাঙ্গ সতীর্থরা যেখানে খেতে যেতেন, সেখানে তার প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ। বার্লিনে যাওয়ার আগে ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব কালার্ড পিপল (এনএএসিপি)-এর সচিব ওয়াল্টার ফ্রান্সিস হোয়াইট তাকে অলিম্পিকে না যাওয়ার পরামর্শ দেন। তবে আমেরিকান অলিম্পিক কমিটির প্রধান আভেরি ব্রান্ডেজ ঘোষণা করেন, গেমস রাজনীতির জায়গা নয়, অ্যাথলেটদের জায়গা।
বার্লিনে পৌঁছে অলিম্পিক ভিলেজে অ্যাডিডাসের প্রতিষ্ঠাতা এডি ড্যাসলারের সঙ্গে দেখা হয় ওয়েন্সের। ড্যাসলার তাকে জুতা পরার প্রস্তাব দেন এবং ওয়েন্স রাজি হন। এটি ছিল কোনো আফ্রিকান-আমেরিকান অ্যাথলেটের প্রথম স্পনসরশিপ। এর আগে শিকাগোয় ১০০ মিটার দৌড়ে বিশ্ব রেকর্ড (১০.২ সেকেন্ড) গড়ে বার্লিনে এসেছিলেন তিনি। অলিম্পিকের হিটে দুবার সেই রেকর্ড স্পর্শ করেন। ৩ আগস্ট ফাইনালে ১০.৩ সেকেন্ডে সোনা জেতেন।
লং জাম্পের ঘটনা আরও স্মরণীয়। ফাইনালের আগে তার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী জার্মান অ্যাথলেট লুজ লং তাকে পরামর্শ দেন, যেখান থেকে লাফ দিতে হবে সেখানে একটি তোয়ালে ফেলে রাখতে, যাতে ডিসকোয়ালিফাইড হওয়ার ঝুঁকি না থাকে। ওয়েন্স সেই পরামর্শ মেনে নেন এবং ২৬ ফুট ৫ ইঞ্চি লাফ দিয়ে সোনা জেতেন। রুপাজয়ী লং লাফিয়ে বালির ওপর পড়ে তাকে শুভেচ্ছা জানান। এই ঘটনা নাৎসিদের চোখ এড়ায়নি, তারা লংকে নজরদারিতে রাখে। ৫ আগস্ট ২০০ মিটার এবং তিন দিন পর ৪০০ মিটার রিলেতে বিশ্ব রেকর্ড গড়ে (৩৯.৮ সেকেন্ড) চতুর্থ সোনা জেতেন ওয়েন্স। রিলেতে নামার কথা ছিল ইহুদি অ্যাথলেট স্টোলার ও গ্লিকম্যানের, কিন্তু দৌড়ের দিন সকালে তাদের বাদ দিয়ে ওয়েন্স ও রালফ মেটক্যাফেকে বসান স্প্রিন্ট কোচ লসন রবার্টসন। এর কোনো অফিশিয়াল ব্যাখ্যা কখনো দেওয়া হয়নি, তবে সংবাদমাধ্যমের ধারণা, জার্মানদের ঠান্ডা রাখতেই এই সিদ্ধান্ত।
ওয়েন্সের এই কৃতিত্বকে ইএসপিএন বর্ণনা করেছে 'হিটলারের আর্য শ্রেষ্ঠ মিথকে একাই ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া' হিসেবে। তবে দেশে ফেরার পর তার প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। অলিম্পিক শেষে তাকে ইউরোপ সফরে পাঠানো হয় অর্থ সংগ্রহের জন্য, কিন্তু সেই সফরে তার শারীরিক ক্লান্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। প্রাগে যাওয়ার দিন সকালে বিমানবন্দরে তার কাছে একটি টাকাও ছিল না, যাত্রীরা তাকে দুধ ও স্যান্ডউইচ কিনে দেন। এমনকি ক্রয়ডন বিমানবন্দরে ফাঁকা হ্যাঙ্গারে ঘুমিয়েও রাত কাটাতে হয়েছে তাকে। সফরে তিনি ১১ পাউন্ড ওজন হারান এবং দেশে ফিরে আসেন, কিন্তু তার পরেই আমেরিকান অ্যাথলেটিক ইউনিয়ন তাকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করে। কারণ, ইউরোপ সফর শেষ না করায় তার বিরুদ্ধে নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়।
মাত্র ২৪ বছর বয়সে শেষ হয়ে যায় তার অ্যাথলেটিক ক্যারিয়ার। সংসার চালাতে শুরু করেন মোটরবাইক, গাড়ি, ঘোড়া এমনকি কুকুরের সঙ্গে প্রদর্শনী দৌড়। ১৯৩৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর কিউবার হাভানায় একটি ফুটবল ম্যাচের বিরতিতে ঘোড়া জুলিও ম্যাককাওয়ের সঙ্গে দৌড়ে জিতেছিলেন তিনি। এই ঘটনা নিয়ে তিনি বলেছিলেন, 'লোকে বলে ঘোড়ার সঙ্গে দৌড়ানো অলিম্পিক চ্যাম্পিয়নের জন্য অপমানজনক। কিন্তু আমি কী করতে পারি? আমার কাছে চারটি সোনার পদক আছে, কিন্তু সোনার পদক তো খাওয়া যায় না।'
জন্ম ১৯১৩ সালে আলাবামার ওকভিলে, বাবা ছিলেন বর্গাচাষি, দাদা ছিলেন ক্রীতদাস। নয় বছর বয়সে পরিবারসহ ক্লিভল্যান্ডে চলে আসেন। সেখানেই স্কুলের কোচ ফ্রাঙ্ক রাইলে তার প্রতিভা আবিষ্কার করেন। স্কুলে রোল কলের সময় শিক্ষকের ভুল উচ্চারণে 'জে সি' নামটি হয়ে যায় 'জেসি'। বার্লিন অলিম্পিকে ঐতিহাসিক সাফল্যের পরও তার দেশ তাকে সেভাবে বরণ করেনি। ওয়ালডর্ফ আস্তুরিয়া হোটেলে তার সম্মানে আয়োজিত সংবর্ধনায় তাকে শ্বেতাঙ্গদের লিফটে ওঠানো হয়নি, মালামাল তোলার লিফটে যেতে হয়েছে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টও তাকে হোয়াইট হাউসে নিমন্ত্রণ বা অভিনন্দন বার্তা পাঠাননি। এ নিয়ে ওয়েন্স বলেছিলেন, 'হিটলার আমাকে হাত মেলাতে নিমন্ত্রণ করেননি, তবে প্রেসিডেন্টও হাত মেলাতে হোয়াইট হাউসে আমাকে নিমন্ত্রণ জানাননি।'
তবে পরবর্তী জীবনে স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। পঞ্চাশের দশকে প্রেরণাদায়ী বক্তা হিসেবে কাজ শুরু করেন। জার্মানিতে তার নামে রাস্তার নামকরণ হয়। ১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম পান। দীর্ঘদিন ধূমপানের কারণে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৮০ সালের ৩১ মার্চ অ্যারিজোনায় ৬৬ বছর বয়সে মারা যান। তার মৃত্যুতে নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছিল, 'ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের ইতিহাসেই সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত অ্যাথলেট।' শিকাগোর লেক অব মেমোরিজে তার সমাধিফলকে লেখা আছে— 'একজন বিজয়ী, যিনি জানতেন জয়ই সবকিছু নয়।'




