আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ পলাতক অভিযুক্তদের অনুপস্থিতিতে বিচারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান ঘোষণা করেছে। সোমবার যুক্তিতর্কের সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী স্পষ্ট ভাষায় জানান, যারা এই প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানাচ্ছেন, তাঁদের কার্যকর বিকল্প প্রস্তাব করতে হবে। অন্যথায় তাঁদের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হবে না। এই মন্তব্য আসে নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ মোট সাতজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার শুনানিকালে। মামলার অন্য অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান, এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ। সকলেই বর্তমানে পলাতক অবস্থায় রয়েছেন এবং তাঁদের অনুপস্থিতিতেই মামলাটি বর্তমানে রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে।
শুনানির এক পর্যায়ে প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পলাতক অভিযুক্তদের অনুপস্থিতিতে বিচার পরিচালনা ন্যায়বিচারের পথে সহায়ক কিনা, তা নিয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, আসামি নিজে উপস্থিত না থাকলে এবং আইনজীবীর মাধ্যমে যথাযথ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না পেলে ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্ত পূরণ হয় না।
এই বক্তব্যের জবাবে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, যদি কোনো বিকল্প ব্যবস্থা থাকে, তাহলে সেই দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব। কিন্তু তেমন কোনো পথ দেখানো না হলে বর্তমান পদ্ধতিই অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও বলেন, সমালোচকদের উচিত স্পষ্টভাবে বলা যে, বিকল্প পথ বা সমাধান কী। যদি তাঁরা এমন কোনো উপায় দেখাতে না পারেন, তবে তাঁদের বক্তব্য শোনা হবে না।
ট্রাইব্যুনাল-২–এর সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এ বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রতিটি দেশেই অনুপস্থিত আসামির বিচারের বিধান কার্যকর রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রেও একই ধরনের আইন প্রচলিত। রোম সংবিধির ৬১ নম্বর ধারার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি ব্যাখ্যা করেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় আদালতে উপস্থিত হয়ে শুনানি গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে অনুপস্থিত থাকেন অথবা আইনজীবী নিয়োগ না করেন, তাহলে তাঁর অনুপস্থিতিতে বিচার করা সম্ভব। তবে তিনি সতর্ক করেন, এই বিধানের কঠোর প্রয়োগের ফলে অপরাধীদের বিচার এড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে, যা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারকে ক্ষুণ্ন করবে।
প্রসঙ্গত, জুলাই মাসে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি মামলায় অনুপস্থিত আসামি হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংক্রান্ত আরও কয়েকটি মামলায় পলাতক অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণা করা হয়েছে।
বিচারকরা স্পষ্ট করে দেন, বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টার চেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খুঁজে বের করাই গুরুত্বপূর্ণ। পলাতক আসামিদের বিচারের জন্য কার্যকর বিকল্প না দেখাতে পারলে কেবল সমালোচনা করে বিচারিক কার্যক্রমকে থামানো যাবে না। ট্রাইব্যুনালের মতে, ন্যায়বিচারের দাবিদারদের অধিকার রক্ষাই এ মুহূর্তে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।




