ব্রাজিল জাতীয় দল ও ইংলিশ ক্লাব লিভারপুলের গোলরক্ষক আলিসন বেকার প্লেয়ারস ট্রিবিউনে তার বাবার স্মৃতিচারণ করে এক দীর্ঘ ও আবেগঘন লেখা প্রকাশ করেছেন। সেখানে উঠে এসেছে শৈশবের কথা, বাবার সঙ্গে ফুটবল খেলার স্মৃতি এবং ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় বাবার আকস্মিক মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনা।

আলিসন লেখার শুরুতে তার বাবার তরুণ বয়সের একটি ছবির বর্ণনা দেন, যা তার কাছে এখনও রঙিন ও স্বপ্নের মতো স্পষ্ট। তিনি স্মরণ করেন কিভাবে তিন বছর বয়সে বড় ভাই মুরিয়েলের সঙ্গে বসার ঘরের কার্পেটে মিনি ফুটবল খেলতেন। ক্লান্ত বাবা সোফায় শোয়ার পর দুই ভাই মিলে তাকে টেনে তুলে খেলতে নামাতেন। বাবা তখন বিখ্যাত ব্রাজিলীয় গোলরক্ষক ক্লদিও তাফারেল সাজার ভান করতেন এবং সোফার নিচের ফাঁকা জায়গা থেকে হাত বের করে পেনাল্টি ঠেকানোর অভিনয় করতেন, যা দেখে শিশু আলিসন ও মুরিয়েল হেসে লুটোপুটি খেতেন। আলিসন বলেন, 'স্মৃতিটা এত জীবন্ত যে মনে হয় আজও আমি এর গন্ধ পাই। সোফার গন্ধ, মায়ের রান্না করা খাবারের গন্ধ, বাবার জামার গন্ধ।'

তিনি উল্লেখ করেন, তার বাবাও একজন গোলরক্ষক ছিলেন এবং মাঠের ভেতরে নির্ভীক ছিলেন। বাবার বন্ধুরা তাকে 'পাগল' বলতেন কারণ তিনি আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ের বুটের সামনে মুখ বাড়িয়ে দিতে দ্বিধা করতেন না। এই সাহসী বাবার আকস্মিক মৃত্যু আলিসনের জীবনে বিরাট ধাক্কা হিসেবে আসে। ২০২০-২১ মৌসুমে লিভারপুলে খেলার সময় মায়ের ফোনে তিনি জানতে পারেন, বাড়ির পাশের লেকে ডুবে বাবা মারা গেছেন। আলিসন পুরোপুরি ভেঙে পড়েন এবং ফুটবল নিয়ে ভাবতে পারছিলেন না।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছিল কারণ সেটা ছিল করোনা মহামারির সময়। ব্রাজিলে গিয়ে শেষকৃত্যে অংশ নিলে ফিরে এসে ১৪ দিন বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে থাকতে হতো। তাছাড়া তার স্ত্রী নাটালিয়া তখন তাদের তৃতীয় সন্তানের গর্ভে ছিলেন এবং ডাক্তার ভ্রমণকে ঝুঁকিপূর্ণ বলায় তাকে একা রেখে যাওয়াও সম্ভব ছিল না। বাবা সবসময় বলতেন নাটালিয়াকে তিনি আলিসনের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন। তাই মা ও ভাইয়ের সঙ্গে ফোনে অনেক কান্নাকাটি করার পর আলিসন শেষকৃত্যে না যাওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। তিনি লেখেন, 'সেটাই ছিল আমার জীবনের নিষ্ঠুরতম ফোনকল।' তিনি ফেসটাইমের মাধ্যমে শেষকৃত্য দেখেন এবং লিভারপুলে বসে মায়ের সঙ্গে প্রার্থনা ও কান্নায় শরিক হন।

শেষকৃত্যের কয়েক দিন পর অনুশীলনে ফিরে বাবার কথা মনে পড়লে তিনি মাঠে দাঁড়িয়েই কাঁদতে শুরু করতেন। তবে সতীর্থদের অসাধারণ সহযোগিতা তাকে ধীরে ধীরে খেলায় ফেরাতে সাহায্য করে। আলিসন লেখেন, 'ফুটবলকে আমি নিজে বেছে নিইনি। অবচেতন মনে যা লুকিয়ে আছে, যা ইতিমধ্যে আপনার হাড়ে–মজ্জায় মিশে গেছে, তা আপনি বেছে নিতে পারেন না।' মাঠে ফেরা তাকে মানসিক শান্তি দেয় এবং তিনি অনুভব করেন যেন ঢেউয়ে চড়ে অবশেষে শান্ত জলে এসে পৌঁছেছেন।

শেষাংশে আলিসন বলেন, এখন তার ছেলেও অনুশীলন শেষে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরলে তার হাতে বল গুঁজে দিয়ে খেলতে ডাকে। তারা এখন সত্যিকারের একটি মিনি গোলপোস্ট কিনেছে এবং তিনিও বাবার মতো মেঝেতে শুয়ে ছেলের শট আটকানোর চেষ্টা করেন। ছেলে সালাহ বা ভিনি জুনিয়র সাজলেও আলিসন 'তাফারেল' হতে চাইলেও তাকে 'আলিসন' হতেই হয়। তার কাছে মনে হয় 'যেন সেই পুরোনো ঘটনারই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। যেন সেই পুরোনো গল্পের বইটাতেই যোগ হচ্ছে নতুন পৃষ্ঠা।'