ইসলামি ইতিহাসের প্রথম শতাব্দীটি ছিল এক অনন্য সময়, যখন নবীজির সাহাবি, তাবেয়ি ও নতুন মুসলিম সমাজের নির্মাতারা একত্রে পথ চলেছেন। মদিনার গলিতে তখনো ওহির যুগের স্মৃতি প্রতিধ্বনিত হতো, আর বসরার মসজিদগুলোতে জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছিল। সেই সময়েই আবির্ভূত হন এক মহান ব্যক্তিত্ব—হাসান বসরি (রহ.), যাঁর কণ্ঠে মানুষ কোরআনের আবেদন শুনত, চোখে দেখত তাকওয়ার দীপ্তি, আর জীবনে খুঁজে পেত দুনিয়াবিমুখ এক আল্লাহভীরু মানুষের প্রতিচ্ছবি।

তাঁর জীবন শুরু হয়েছিল এক বিস্ময়কর পটভূমিতে। পিতা ইয়াসার ও মাতা খাইরা—উভয়েই ছিলেন ইরাক বিজয়ের সময় বন্দী হয়ে মদিনায় আগত যুদ্ধবন্দী। তাদের বিভিন্ন সাহাবির মধ্যে দাস হিসেবে বণ্টন করা হয়। ইয়াসার চলে যান বিশিষ্ট সাহাবি জায়েদ ইবনে সাবিতের (রা.) ঘরে, আর খাইরা আশ্রয় পান নবীজির স্ত্রী উম্মে সালামার (রা.) সান্নিধ্যে। ২১ হিজরিতে মদিনায় জন্ম নেন হাসান, তখন খলিফা ছিলেন হজরত ওমর (রা.)। তাঁর শৈশবের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ছিল মদিনার সেই পবিত্র পরিবেশ, যেখানে নবীজির স্মৃতি তখনো জীবন্ত। মা খাইরা উম্মে সালামার খেদমত করতেন, আর কাজের ব্যস্ততায় ছোট্ট হাসান কাঁদলে উম্মে সালামা নিজেই তাকে বুকে জড়িয়ে নিতেন। একাধিক বর্ণনা অনুসারে, তিনি শিশু হাসানকে স্তন্যদান করতেন। মুসলিম ঐতিহ্যে বিশ্বাস করা হয়, এই সান্নিধ্যের বরকতই পরবর্তীকালে হাসান বসরির জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আধ্যাত্মিকতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

শৈশবে তিনি বহু সাহাবির দোয়া লাভ করেন। খলিফা ওমর (রা.) তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন, 'হে আল্লাহ, তাকে ধর্মের গভীর জ্ঞান দান করুন এবং মানুষের কাছে তাকে প্রিয় করে দিন।' অল্প বয়সেই তিনি মসজিদে নববিতে জুমার নামাজ আদায় করেছেন এবং খলিফা ওসমানের (রা.) খুতবা শুনেছেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে কোরআন হিফজ সম্পন্ন করেন, বহু হাদিস মুখস্থ করেন এবং লেখালেখি ও হিসাববিদ্যায় দক্ষ হয়ে ওঠেন। সিফফিনের যুদ্ধের পর তাঁর পরিবার বসরায় স্থায়ীভাবে চলে আসে। সেখানে তিনি সাহাবি ও তাবেয়ি আলিমদের কাছ থেকে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় শিক্ষা লাভ করেন। বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, জাবের ইবনে আবদুল্লাহ, ইমরান ইবনে হোসাইন ও মুগিরা ইবনে শু'বা (রা.)-সহ অনেকের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণের সৌভাগ্য তাঁর হয়। কোরআন শিক্ষাও নেন বিশিষ্ট কারিদের কাছ থেকে।

একসময় তিনি নিজেই হয়ে ওঠেন অসাধারণ শিক্ষক। তাঁর শিক্ষাদানের পদ্ধতি ছিল ব্যতিক্রমী। প্রতিদিন দুটি 'দরস' বসত—একটি মসজিদে, যেখানে সাধারণ মানুষ অবাধে প্রশ্ন করতে পারত। আশ্চর্যের বিষয়, সব প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজে দিতেন না; বরং তাঁর ছাত্রদেরও উত্তর দিতে উৎসাহিত করতেন। এর মাধ্যমে তিনি শুধু জ্ঞান দিতেন না, নতুন আলেমও তৈরি করতেন। অন্যদিকে তাঁর ঘরের দরস ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে উপস্থিত হতেন বিশেষ আল্লাহভীরু মানুষজন। সেই আসরে আলোচনা হতো আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া, ইখলাস ও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার বিষয়ে। কখনো কখনো সেই আলোচনা এত দীর্ঘ হতো যে পরিবারের সদস্যরা বিরক্ত হয়ে যেতেন, কিন্তু পরে তাঁরা বুঝে নিতেন—এ কাজ মানুষের হৃদয় গড়ার কাজ।

হাসান বসরি (রহ.) শুধু মসজিদের মানুষ ছিলেন না। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রেও ছিলেন সাহসী—কাবুল অভিযানে অংশ নিয়েছেন, খোরাসানের প্রশাসনিক দায়িত্বে কাজ করেছেন এবং ওমর ইবনে আবদুল আজিজের যুগে বসরার বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বিচারকের মতো মর্যাদাপূর্ণ পদে থেকেও তিনি কোনো বেতন গ্রহণ করতেন না; তাঁর কাছে পদ ছিল দায়িত্ব, উপার্জনের মাধ্যম নয়।

তাঁর জীবন ছিল ইবাদত ও আত্মসংযমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রতি মাসের আইয়ামে বিজ, সোম ও বৃহস্পতিবারের রোজা তিনি নিয়মিত পালন করতেন। রাতের অধিকাংশ সময় কাটত তাহাজ্জুদ, কোরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর স্মরণে। পৃথিবীর চাকচিক্য তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারেনি; বরং তিনি মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিতেন—দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, আখেরাতই চিরস্থায়ী।

হাসান বসরির প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে সাহাবিরাও তাঁর জ্ঞানের স্বীকৃতি দিয়েছেন। একবার সাহাবি আনাস ইবনে মালিককে (রা.) একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, 'হাসানের কাছে জিজ্ঞেস করো।' উপস্থিত লোকেরা বিস্মিত হয়ে বলল, 'আমরা তো আপনাকেই জিজ্ঞেস করছি!' তিনি উত্তর দিলেন, 'আমরাও শুনেছি, সে–ও শুনেছে। তবে তার মনে আছে, আর আমরা ভুলে গেছি।' সমসাময়িকেরাও তাঁকে অসাধারণ সম্মান করতেন। কাতাদা (রহ.) মন্তব্য করেছিলেন, 'পূর্ণ মানবিকতার দিক থেকে হাসান বসরির মতো মানুষ আর কাউকে দেখিনি।'

তাঁর ছাত্রদের তালিকাও ছিল ঈর্ষণীয়। মালেক ইবনে দিনার, সাবেত বুনানি, ইবনে আওনের মতো পরবর্তী যুগের বিখ্যাত মনীষীরা তাঁর কাছ থেকেই জ্ঞান ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা লাভ করেন। এভাবেই তিনি শুধু নিজের যুগকেই আলোকিত করেননি, পরবর্তী শতাব্দীগুলোকেও আলোকিত করে গেছেন। হাসান বসরির রচিত তাফসির, আকিদা ও আধ্যাত্মিকতাবিষয়ক গ্রন্থসমূহ পরবর্তী যুগের আলেমদের জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে ওঠে। যদিও তাঁর বহু বক্তব্য মৌখিকভাবেই মানুষের হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, তবু সেগুলোর প্রভাব আজও ইসলামি চিন্তার জগতে অনুভূত হয়।

১১০ হিজরির রজব মাসের এক শুক্রবার রাতে এই মহান তাবেয়ি ইন্তেকাল করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। তাঁর জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছিল—লোকসমাগম এত বেশি ছিল যে সেদিন বসরার কেন্দ্রীয় মসজিদে নিয়মিত আসরের জামাত অনুষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি; মানুষের ভিড়ে তা বাইরে আদায় করতে হয়েছিল। একজন মানুষের জীবনের সফলতা কি এর চেয়ে বড় হতে পারে? জন্মেছিলেন এক যুদ্ধবন্দীর সন্তান হিসেবে, কিন্তু মৃত্যুর সময় হাসান বসরি (রহ.) ছিলেন একটি জাতির বিবেক, একটি যুগের শিক্ষক এবং ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাবেয়ি।