হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড সঠিকভাবে অনুসরণ করতে পারছে না। নিউইয়র্কভিত্তিক এই মানবাধিকার সংস্থাটি আশঙ্কা করছে, এই ব্যর্থতার কারণে শুধু ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন না, বরং আইনের শাসনও দুর্বল হবে এবং অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা পুনরায় ঘটতে পারে।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটররা গত ২৭ জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িত রাজনীতিবিদ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং সাংবাদিকেরাও। ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভের মুখে ১৫ বছরের বেশি সময়ের শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া বিষয়ক উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেছেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি, তবে অভিযুক্ত করার সময় ন্যায়বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখা হচ্ছে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নতুন সরকারের উচিত ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত ও ভিত্তিহীন অভিযোগের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থের সুযোগ বন্ধ করা এবং জরুরি ভিত্তিতে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা সংস্কার করা।
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের ঘটনায় আট শতাধিক মানুষের মৃত্যু ও হাজার হাজার আহতের ঘটনায় ট্রাইব্যুনালে মামলা চলছে। সেই আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটায়। এছাড়া হাসিনার শাসনামলে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের মতো অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ট্রাইব্যুনালের এক ডজনের বেশি মামলা পর্যবেক্ষণ করে উদ্বেগজনক চিত্র দেখতে পেয়েছে। তারা জানিয়েছে, প্রসিকিউটররা সাক্ষীদের জবানবন্দির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে একই অপরাধের বর্ণনা একাধিক জবানবন্দিতে হুবহু কপি-পেস্ট করা হয়েছে। হাসিনা সরকারের পতনের পর ট্রাইব্যুনাল ৬টি বিচার সম্পন্ন করেছে, যেখানে ৬২ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে হাসিনাসহ ৪২ জনের অনুপস্থিতিতে বিচার হয়েছে এবং ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তাকারীদের বিচারের জন্য ২০১০ সালের মার্চে হাসিনা সরকার ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল। তখনও তথ্য-প্রমাণের ঘাটতি, রাজনৈতিক পক্ষপাত ও বিচারক-প্রসিকিউটরদের যোগসাজশ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। ২০২৪ সালে বিক্ষোভের মুখে হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে এখতিয়ারভুক্ত অপরাধের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনে। কিন্তু এইচআরডব্লিউ বলছে, সংশোধন সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক আদালতের তুলনায় ট্রাইব্যুনালের বিচারিক মানদণ্ডে ঘাটতি রয়ে গেছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার আইনে আর কোনো সংশোধনী আনেনি। এইচআরডব্লিউর মতে, বর্তমান আইনে প্রসিকিউটরদের প্রমাণ ছাড়াই যে কাউকে গ্রেপ্তার এবং আটকের কারণ না জানিয়েই মাসের পর মাস আটকে রাখার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পৃথক আদালতে অন্তর্বর্তীকালীন আপিলের অধিকার না থাকা, প্রসিকিউশন তথ্য প্রকাশের তিন সপ্তাহের মধ্যে বিচার শুরু করার বিধান এবং আসামির অনুপস্থিতিতে বিচারের ক্ষেত্রে পছন্দমতো আইনজীবী নিয়োগের অধিকার না থাকার মতো সমস্যা রয়েছে। ট্রাইব্যুনাল আসামিপক্ষের আইনজীবীদের সাক্ষীদের জেরার সুযোগও সীমিত করে দিয়েছে।
গত ১৪ মে ট্রাইব্যুনাল দুই সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয়। ২০১৩ সালের মে মাসে হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভ নিয়ে প্রতিবেদনের জন্য ‘একাত্তর টিভি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু ও উপস্থাপক ফারজানা রুপার বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা তথ্য’ প্রচারের অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউটররা। তাদের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারের কারণ লিখিতভাবে জানানো হয়নি, যা আন্তর্জাতিক সনদের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের লঙ্ঘন।




