ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু ছবি প্রথম দর্শনে ব্যর্থ হলেও সময়ের সাথে সাথে ক্লাসিক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। রাজ কাপুরের ‘মেরা নাম জোকার’ তেমনই এক উদাহরণ, যার নির্মাণ যাত্রা আর্থিক ত্যাগ ও ব্যক্তিগত আবেগের অসাধারণ গল্প বলে বিবেচিত হয়। সম্প্রতি রাজ কাপুরের ভাতিজা মন্টি প্রেমনাথ এক সাক্ষাৎকারে জানান, ছবিটির শুটিং শেষ করতে গিয়ে রাজ কাপুর তাঁর স্ত্রী কৃষ্ণা কাপুরের সোনার চুড়ি বন্ধক রেখেছিলেন। মুম্বাইভিত্তিক সাংবাদিক ভিকি লালওয়ানিকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে মন্টি প্রেমনাথ বলেন, ‘মেরা নাম জোকার’ রাজ কাপুরের সবচেয়ে প্রিয় প্রকল্প ছিল। কিন্তু নির্মাণ ব্যয় ক্রমশ বেড়ে যাওয়ায় তীব্র অর্থসংকট দেখা দেয়। সেই সংকট মোকাবিলায় তিনি স্ত্রীর গহনা বন্ধক রাখতে বাধ্য হন। পরে ঋণ পরিশোধের জন্য আরকে স্টুডিও বন্ধক দিতে হয়েছিল বলে জানান তিনি।

চার ঘণ্টার বেশি দৈর্ঘ্যের এই ছবি নিয়ে অভিনেতা-পরিচালক মনোজ কুমার আপত্তি জানিয়েছিলেন। মন্টি প্রেমনাথের মতে, মনোজ কুমার রাজ কাপুরকে ছবির দ্বিতীয় ও তৃতীয় অংশ পুনরায় সম্পাদনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘দ্বিতীয় ও তৃতীয় অংশ আমাকে সম্পাদনা করতে দিন।’ কিন্তু রাজ কাপুর সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘এটি আমার সৃষ্টি। আমি কাউকে এতে হাত দিতে দেব না। যা বানিয়েছি, সেটাই আমার বিশ্বাস।’ মনোজ কুমার তাঁকে বিপুল ব্যয়ের কথা মনে করিয়ে দিলে রাজ কাপুর জবাব দেন, ‘সিনেমা থেকেই আমি সব অর্থ উপার্জন করেছি, আর সেই অর্থ আবার সিনেমাতেই বিনিয়োগ করেছি।’

দুটি বিরতি সহ ৪ ঘণ্টা ১৫ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই ছবিটি মুক্তির পর বক্স অফিসে ভয়াবহ ব্যর্থ হয়। লোকসানের ফলে রাজ কাপুর বিপুল ঋণের মুখে পড়েন। অভিনেতা প্রেম চোপড়া এক সাক্ষাৎকারে সেই সময় স্মরণ করে বলেন, ‘রাজ কাপুর কার্যত নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলেন। মেরা নাম জোকার ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হওয়ার পর তাঁকে আরকে স্টুডিও বন্ধক রাখতে হয়েছিল, এমনকি পারিবারিক সম্পত্তিরও কিছু অংশ বিক্রি করতে হয়েছিল।’

মনোজ কুমারের ছেলে কুনাল গোস্বামীও আগে জানিয়েছিলেন, তাঁর বাবা ছবির দ্বিতীয়ার্ধ সম্পাদনার পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। আরেক সাক্ষাৎকারে মনোজ কুমার দাবি করেন, ছবিটির একটি পর্বের গল্প নির্মাণে তাঁরও ভূমিকা ছিল, তবে তিনি এর জন্য কোনো স্বীকৃতি বা পারিশ্রমিক নেননি। এমনকি শুটিংয়ের সময় নিজের যাতায়াত ও হোটেল খরচও নিজেই বহন করেছিলেন। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল রাজ কাপুরের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন।

‘মেরা নাম জোকার’-এর ব্যর্থতায় আরকে স্টুডিও বড় আর্থিক সংকটে পড়লেও তিন বছর পর ১৯৭৩ সালে ‘ববি’ ছবির অভাবনীয় সাফল্য রাজ কাপুরকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেয়। ঋষি কাপুর ও ডিম্পল কাপাডিয়ার অভিনীত এই সিনেমাটি আরকে স্টুডিওকে আবারও সাফল্যের শীর্ষে ফিরিয়ে আনে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে।