ব্রিটিশ কবি জেফ্রি হিল ‘ভালোবাসার বিজয়’ কবিতায় কবিতাকে ‘বিষণ্ন ও ক্রোধান্বিত সান্ত্বনা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। ইসমাইল সাদীর কবিতায় এই দুই অনুভূতির এক অসাধারণ মিশ্রণ দেখা যায়। তাঁর ‘তিন শব্দের চোখ’ কাব্যগ্রন্থের নামের আপাত সরলতার ভেতরে লুকিয়ে আছে ধোঁকাপূর্ণ সরলতা বা ‘ডিসিপটিভ সিম্পলিসিটি’র নৈপুণ্য, যা পাঠকের মনে কৌতূহল সৃষ্টি করে।
সাদীর কবিতার বাহ্যিক সরলতা অমনোযোগী পাঠককে ছড়া ভেবে ঠকাতে পারে, কিন্তু অন্তর্নিহিত মর্মার্থ গভীরভাবে ভাবায়। যেমন ‘মেঘ ও জোছনা’ কবিতার লাইন—‘প্রেমের সড়কে নেই পাপের মিছিল / আঁধার নদীতে ভাসে মৃত গাঙচিল’—থেকে বোঝা যায় তাঁর কাব্যিক ভাষার গীতিময়তা। বর্তমান যুগে মুক্তছন্দের প্রাধান্যের মধ্যেও ছন্দোবদ্ধ ও গীতিময় কবিতা লেখা একটি দুঃসাহসিক কাজ। সাদীর দীর্ঘ গবেষণা ও বাচিক চর্চা তাঁকে ছন্দের সহজাত ব্যবহারে পারদর্শী করে তুলেছে, যদিও সমকালীন পাঠকের কাছে তা কেমন গ্রহণযোগ্য হবে তা নিয়ে কিছু ঝুঁকি থেকেই যায়।
শব্দচয়নেও সাদী প্রাত্যহিক শব্দ এড়িয়ে কাব্যিক ও পরিশীলিত শব্দ ব্যবহার করেছেন, যা তাঁকে সমসাময়িক কবিদের থেকে ভিন্ন করে। যেখানে অনেক কবি কবিতাকে অতি কাব্যিকতা থেকে মুক্তি দিতে চান, সেখানে সাদী কাব্যিকতা পুনঃস্থাপন করে চিরায়ত স্বাদ ফিরিয়ে এনেছেন। বইয়ের দ্বিতীয় ভাগের সনেট সিকুয়েন্স বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিন’-এর স্মৃতি জাগায়। ‘শ্রাবস্তী ৪’ সনেটের স্তবক—‘কাঁধের ঘ্রাণের মানে বোঝে না অকাল প্রেমের তেমন ভোরে’—এর উদাহরণ দেয়া যায়।
রাজনীতি ও সমকালীন সংকটের পাশাপাশি সাদীর কবিতায় প্রেমময়তাও বিস্ময়করভাবে ফুটে ওঠে। ‘অনুরাগ’ কবিতায় পরনারী বা পরপুরুষের প্রতি আদিম আকর্ষণ কাব্যিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে: ‘তুমিই হয়তো যাচ্ছো রেখে দাগ / ভাবছি তোমার কীসের অনুরাগ’। তাঁর কবিতায় ভাষা ও প্রকাশ পূর্ববর্তী কাব্যধারার অনুগামী হলেও অর্থ শতভাগ সমসাময়িক। একজন সংবেদনশীল কবি হিসেবে তিনি প্রতিদিনের অনাচার, দুঃশাসন ও অন্যায়ে আহত। প্রকৃতি ও পরিবেশ-বিধ্বংসী বিভীষিকা, বিশেষ করে বাংলাদেশের নদীর ওপর আঘাত তাঁর কবিতায় বারবার প্রতিভাত হয়। ‘ধলেশ্বরী’ কবিতায় লাইন—‘নদীর ছড়ানো বুক দেশের মতোন / হিংসার বিঁধানে নখে কূলে ক্ষত হয়’—এ প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিক।
দীর্ঘ সাহিত্যচর্চার পর বিলম্বিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে সাদী বুঝিয়েছেন, এখনই সময় তাঁর কবিতাকে পাঠকের সামনে আনার। আবেগ, যাপিত অভিজ্ঞতা, ইতিহাস ও রাজনীতিসচেতনতার শৈল্পিক ও ভাষিক প্রকাশ এই গ্রন্থ। শারীরবৃত্তিক চাহিদার ঊর্ধ্বে মানুষের নিগূঢ়তম আবেগ ও অনুভূতি তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্য। ‘মতিহার’ কবিতাটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের স্মৃতি জাগিয়ে ঘোর লাগা স্মৃতিকাতরতা ও হৃদয় মথিত আবেগ সৃষ্টি করে। এই কবিতার শেষাংশ—‘মতিহারে নেই আর তেমন যাপন গতি / ফের আসবে না শরীরের বাণে’—থেকে বোঝা যায় কাব্যগ্রন্থটি মতিহারের সবুজ ক্যাম্পাসের মতো পাঠকের মনে চির সবুজ হয়ে থাকার প্রত্যাশা রাখে।

