হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণের পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবস্থান ও প্রভাব নিয়ে আলোচনা থেমে নেই। তাঁর সৃষ্টির গভীরে গিয়ে দেখা যায়, তিনি কেন এক অনন্য ‘ফেনোমেনন’ হয়ে উঠেছেন। লেখক হিসেবে তাঁর উত্থান আশির দশকের ঢাকায় ঘটে, যখন দেশের টেলিভিশন ও সাহিত্যাঙ্গনে তিনি নতুন এক ধারা সূচনা করেন। সে সময়ের সীমিত যোগাযোগ ও একচেটিয়া টিভি চ্যানেলের যুগে হুমায়ূনের নাটক ও উপন্যাস যুবসমাজে বিপুল সাড়া ফেলে।
হুমায়ূনের লেখার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো পূর্ব বাংলার নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও সংস্কৃতির স্বতঃস্ফূর্ত ব্যবহার। কলকাতার প্রমিত বাংলার হেজিমনির বিরুদ্ধে তিনি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কথ্যভাষাকে সাহিত্যে স্থান দেন। তাঁর চরিত্রগুলো ই এম ফর্স্টারের ‘ফ্ল্যাট ক্যারেক্টার’ ধাঁচের, যেখানে আদর্শায়ন ও মিষ্টতা প্রাধান্য পায়। বাস্তব জীবনের কঠোরতা ও জটিলতা এড়িয়ে তিনি পাঠককে স্বপ্ন ও আশাবাদের জগৎ উপহার দেন।
হিউমার ও সহজবোধ্য ভাষা তাঁর লেখার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক। বাংলা সাহিত্যে হিউমারকে প্রায়ই তুচ্ছ ভাবা হতো, কিন্তু হুমায়ূন তা ভেঙে দেন। তাঁর গদ্য স্বতঃস্ফূর্ত, বাক্য ছোট ও সরল। অভিধানের সাহায্য ছাড়াই যে কেউ তাঁর লেখা উপভোগ করতে পারে। এই ‘অ্যাকসেসিবিলিটি’ তাঁর পাঠকবৃত্তকে বিশাল করেছে।
তাঁর লেখায় নাগরিক ও গ্রামীণ জীবনের ব্যবধান ঘুচে যায়। রাজনীতি ও মতাদর্শিক বিতর্ক থেকে সচেতন দূরত্ব বজায় রেখে তিনি সর্বস্তরের পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য হন। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সবাই তাঁর লেখায় নিজেকে খুঁজে পায়। ব্যক্তি হুমায়ূনের আটপৌরে, ঘরোয়া ভাবমূর্তিও এই জনপ্রিয়তাকে ত্বরান্বিত করে।
কিশোর ও তরুণদের জন্য তাঁর সাহিত্যের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হিমু, মিসির আলী, শুভ্রর মতো চরিত্রের মাধ্যমে তিনি তরুণ প্রজন্মের কল্পনা ও স্বপ্নকে উসকে দেন। আগে বাংলা সাহিত্যে এই বয়সীদের জন্য তেমন কোনো ধারা ছিল না। হুমায়ূন একাই এই শূন্যতা পূরণ করেন এবং অন্যদেরও পথ দেখান।
আশির দশকের আশাবাদী ঢাকা শহরের প্রেক্ষাপটে তাঁর লেখা বিশেষভাবে মানানসই ছিল। সেদিনের উন্নয়নের স্বপ্ন ও উদ্দীপনা তাঁর সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর লেখার জুভেনাইল স্পিরিট অপরিবর্তিত থাকে, যা পাঠকদের আকর্ষণ ধরে রাখে। জীবনযন্ত্রণার পরেও তাঁর লেখায় আশাবাদের বার্তা পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে।
হুমায়ূন আহমেদের সাফল্যের পেছনে তাঁর ভাষাগত মধ্যপন্থা, সমন্বয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও নিম্নকণ্ঠ অবস্থান কাজ করেছে। তিনি পূর্ব বাংলার পাঠকের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব নিরসনে ভূমিকা রেখেছেন, যা তাঁকে ‘মেডিসিন ম্যান’-এর মতো করে তুলেছে। তারুণ্যের অর্গল খুলে দেওয়া, শ্রেণি ও বয়সের সীমা পেরিয়ে যোগাযোগ স্থাপন—এসবই তাঁকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্থায়ী আসন দিয়েছে।
