গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম পদত্যাগ করেন। সংবিধানে নির্ধারিত পাঁচ বছর অথবা ৬৫ বছর বয়স—যা আগে আসে—সেই মেয়াদের বিধান থাকা সত্ত্বেও, এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ৫৪ বছরের ইতিহাসে মাত্র চারজন চেয়ারম্যানই নির্ধারিত পুরো সময় দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হয়েছেন।
১৯৭২ সালে সংবিধানের ১৩৭ অনুচ্ছেদের ওপর ভিত্তি করে পিএসসি গঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ৮ মে একটি আদেশের মাধ্যমে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে এবং ১৯৭৭ সালে পুনর্গঠিত হয়ে একক কমিশন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে চেয়ারম্যান ও অন্যান্য সদস্যরা মেধা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিয়োগ লাভ করেন। কমিশনের অন্তত অর্ধেক সদস্যকে ন্যূনতম ২০ বছরের সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান দায়িত্ব হলো প্রজাতন্ত্রের কর্মে যোগ্য ও মেধাভিত্তিক প্রার্থী বাছাই করা, সিভিল সার্ভিসের পরীক্ষা পরিচালনা করা এবং চাকরির শৃঙ্খলা ও সার্ভিস রুলস বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া—যা রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে; সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া তাঁদের চাইলেই সরানো যায় না।
এই সুরক্ষার পরও ১৮ জন চেয়ারম্যানের মধ্যে মাত্র চারজন পাঁচ বছরের মেয়াদ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম ছিলেন এ কিউ এম বজলুল করিম, যিনি ১৯৭২ সালের ১৫ মে থেকে ১৯৭৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। এরপর এম মইদুল ইসলাম ১৯৭৭ সালের ২২ ডিসেম্বর থেকে ১৯৮২ সালের ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পুরো মেয়াদ কাটান। পরবর্তী সময়ে অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ ১৯৯৩ সালের ১ মার্চ থেকে ১৯৯৮ সালের ৫ মার্চ এবং অধ্যাপক জেড এন তাহমিদা বেগম ২০০২ সালের ৯ মে থেকে ২০০৭ সালের ৭ মে পর্যন্ত সফলভাবে পাঁচ বছর পূর্ণ করেন। অপরদিকে, সা’দত হোসেন ২০০৭ সালের মে থেকে ২০১১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় চার বছর ছয় মাস দায়িত্ব পালন করেন, যা তাঁর বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে শেষ হয়।
বাকি ১০ জন চেয়ারম্যান নির্ধারিত সময়ের আগে পদ ছেড়েছেন। তাঁদের মধ্যে সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ, মোস্তফা চৌধুরী, ইকরাম আহমেদ এবং এ টি আহমেদুল হক চৌধুরীসহ অনেকে সময়ের আগেই সরে দাঁড়ান। ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর সোহরাব হোসাইনও পদত্যাগ করেন। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে পূর্ববর্তী সরকারের আমলে নিযুক্ত চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব ছাড়তে দেখা যায়, যা এখন এক অনানুষ্ঠানিক রীতিতে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক টানাপোড়েন ও শারীরিক অসুস্থতার কারণেও অনেকে অকালেই বিদায় নিয়েছেন।
অধ্যাপক মোনেমের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে পিএসসির সেই দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত হলো। প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সাংবিধানিক কাঠামো থাকলেও, বাস্তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপে অধিকাংশ চেয়ারম্যানকেই পূর্ণ মেয়াদ থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে—যা এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতার প্রশ্নকে বারবার সামনে এনে দেয়।




