গত শুক্রবার কক্সবাজারে প্যারাসেইলিংয়ের সময় আকাশ থেকে সমুদ্রে পড়ে শৌভিক রায় (২৮) নামের এক ভ্রমণার্থী নিহত হয়েছেন। খুলনার এই বাসিন্দা নয় সদস্যের একটি দলের সঙ্গে সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে এসেছিলেন। শনিবার দুপুরের দিকে দরিয়ানগর এলাকার 'সি স্পোর্টস'-এর পরিচালনায় একটি প্যারাসেইলিং পয়েন্ট থেকে উড়াল দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই নিরাপত্তা বাঁধন থেকে ছিটকে পড়েন তিনি। গুরুতর জখম অবস্থায় তাঁকে দ্রুত কক্সবাজার জেলা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, আকাশে ভাসার কিছু মুহূর্ত পরেই তিনি সিট থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েন। এই মর্মান্তিক ঘটনা কক্সবাজারের পর্যটন উপকূলে পরিচালিত প্যারাসেইলিংয়ের নিরাপত্তার মান ও তদারকি নিয়ে পুরনো বিতর্ককে আবারও উস্কে দিয়েছে।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; সাম্প্রতিক কালে অনুরূপ একাধিক দুর্ঘটনার রেকর্ড রয়েছে। ২০২৫ সালের ২০ মে দরিয়ানগর সমুদ্রতটেই প্রবল বাতাসের মধ্যে দুই পর্যটককে একত্রে উড়ানোর সময় এক দম্পতি পানিতে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এর জেরে জেলা প্রশাসন দায়ী প্রতিষ্ঠানের সরঞ্জাম আটক করে সাময়িকভাবে কার্যক্রম স্থগিত করেছিল। একই বছরে অন্য এক নারী পর্যটকও আকস্মিকভাবে সাগরে পড়ে আহত হন; সেবারও নিরাপত্তা লঙ্ঘনের অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, ২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট এক অভিযাত্রী প্যারাসেইল করতে গিয়ে ঝাউগাছের মগডালে ঝুলে থাকার ঘটনাও ঘটে। প্রশাসনিকভাবে বারবার অস্থায়ী স্থগিতাদেশ দেওয়া হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান বা কার্যকর নিয়মনীতি এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়।

শৌভিকের বিদায়ের পর হাসপাতাল চত্তরে তার আত্মীয়-স্বজন ও সঙ্গীদের শোকের পাশাপাশি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ পায়। তারা পরিচালনা কর্তৃপক্ষের সুরক্ষা মান, যানবাহনের সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারি প্রসঙ্গে গভীর সন্দেহ পোষণ করেন। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, দীর্ঘকাল ধরে কক্সবাজারে এ কার্যক্রম চললেও কোনো বিশ্বজনীন নিরাপত্তা অবকাঠামো তৈরি করা হয়নি। প্রশিক্ষিত পরিচালকের অভাব, দৈনন্দিন কারিগরি নিরীক্ষা, জরুরি অবস্থায় উদ্ধার নৌযান ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবার পর্যাপ্ততা নিয়েও প্রশ্ন থেকেই যায়।

পর্যটন বিশ্নেষকদের অভিমত, আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা বলয়ের, শিক্ষিত তত্ত্বাবধায়ক, নিয়মিত যন্ত্র পরীক্ষা, কঠোর পরিবীক্ষণ ও দায়বদ্ধতা নির্ধারণ ছাড়া ভবিষ্যতেও বিপত্তি রোধ করা কঠিন। তাদের প্রস্তাব, স্থায়ী নিরাপত্তা নির্দেশিকা তৈরি না করা পর্যন্ত এই বিপদজনক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রাখা হোক।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, একটি নিরাপদ প্যারাসেইলিং পরিকল্পনার জন্য কয়েকটি উপাদান অপরিহার্য বলে ধরা হয়: প্রশিক্ষিত ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালক, আন্তর্জাতিক গুণগত মানের হারনেস ও দড়ি, প্রত্যহ যন্ত্রাংশ পরীক্ষা, উদ্ধার নৌযান ও লাইফগার্ডের উপস্থিতি, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, আবহাওয়ার বর্তমান খবর রেখে প্রতিকূল পরিবেশে কার্যক্রম স্থগিত, প্রতিবারের ওঠার আগে সংক্ষিপ্ত নিরাপত্তা জ্ঞাপন, এবং যেকোনো বিপদের জন্য দ্রুত উদ্ধার কর্মসূচির প্রস্তুতি।

এসব উদ্বেগের আলোকে ভ্রমণকারীর নিজস্ব সচেতনতাও জরুরি। লাইফ জ্যাকেট ও বাঁধন ঠিকমতো পরা হয়েছে কিনা নিশ্চিত হওয়া, চালক নিরাপত্তামূলক বার্তা দিচ্ছেন কিনা দেখা, ঘূর্ণিঝড় বাতাস বা বৃষ্টিতে না ওঠা, উদ্ধার নৌযানের প্রস্তুতি নিশ্চিত করা এবং কোনো নিরাপত্তা বিধি নিয়ে সন্দিহান হলে সেবা না নেওয়ার ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়া হয়।

প্যারাসেইলিং এক চমৎকার অভিজ্ঞতা হতে পারে, তবে সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় যে কয়েক মিনিটের আকাশচড়ান যেন কোনো পরিবারের জন্য চিরস্থায়ী বেদনার কারণ না হয়ে ওঠে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।