আজ ১০ জুলাই, মালয়েশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী রাজনীতিক মাহাথির মোহাম্মদের জন্মদিন। তিনি এবার ১০১ বছর বয়সে পা রেখেছেন। তাঁর জীবন কেবল দীর্ঘায়ুর গল্প নয়, বরং একটি দেশের আমূল রূপান্তরের কাহিনী। মাহাথির মোহাম্মদ ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত টানা ২২ বছর এবং পরে ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত আরও দুই বছর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী।
১৯২৫ সালে কেদাহ রাজ্যের আলোর সেটারে জন্মগ্রহণ করেন মাহাথির। তাঁর বাবা ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও পরিশ্রমী। চিকিৎসাবিদ্যায় পড়াশোনা শেষ করে তিনি সরকারি চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে নিজ এলাকায় ব্যক্তিগত ক্লিনিক খোলেন এবং 'ডা. এম' নামে পরিচিতি পান। রাজনীতিতে তাঁর পদার্পণ ১৯৪৬ সালে, ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনে (ইউএমএনও) যোগ দেওয়ার মাধ্যমে। মালয় সম্প্রদায়ের স্বার্থে জোরালো অবস্থান নেওয়ায় ১৯৬৯ সালে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও ১৯৭২ সালে পুনর্বহাল হন। পরে তিনি শিক্ষামন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
১৯৮১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর মাহাথির মালয়েশিয়ার অর্থনীতিকে শিল্পায়ন ও রপ্তানিমুখী উৎপাদনের দিকে ধাবিত করেন। তাঁর আমলে পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার, কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, পুত্রাজায়া প্রশাসনিক নগরী এবং নর্থ-সাউথ এক্সপ্রেসওয়ের মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। ১৯৯১ সালে ঘোষিত 'ভিশন ২০২০'-এর মাধ্যমে তিনি মালয়েশিয়াকে একটি উন্নত দেশে পরিণত করার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন। তাঁর নেতৃত্বে মালয়েশিয়ায় মধ্যবিত্ত শ্রেণি সম্প্রসারিত হয় এবং দারিদ্র্য হ্রাস পায়।
তবে তাঁর শাসনামল কর্তৃত্ববাদী আচরণের জন্যও সমালোচিত। ভিন্নমত দমন, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও বিচার বিভাগীয় সংকটের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁর শিষ্য আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ইতিহাসের অংশ। ১৯৯৮ সালে আনোয়ারকে উপপ্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করে সমকামিতা ও দুর্নীতির মামলায় কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অনেকে মনে করেন। মাহাথির অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
২০০৩ সালে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে রাজনীতি থেকে সরে গেলেও দীর্ঘ ১৫ বছর পর দুর্নীতিতে জর্জরিত প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাককে ক্ষমতাচ্যুত করতে তিনি পুনরায় সক্রিয় হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি বিরোধী জোটের নেতৃত্ব দিয়ে জয়লাভ করেন এবং ৯৪ বছর বয়সে বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে নতুন করে দ্বন্দ্ব শুরু হলে তিনি ২০২০ সালে পদত্যাগ করেন।
বর্তমানে ১০১ বছর বয়সী মাহাথির শারীরিকভাবে দুর্বল হলেও মানসিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয়। সম্প্রতি তিনি পডকাস্টে নিজের শারীরিক অবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ও উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তিনি আধুনিক মালয়েশিয়া গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি যেকোনো মূল্যায়নে ইতিহাসের পাতায় একটি অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবেন।




