শনিবার রাতে গুলশান ১ নম্বরের ১৩৬ নম্বর রোডের বাসায় ফিরে এলো যেন প্রাণচাঞ্চল্য। দীর্ঘদিন পর সেই বাড়িতে দেখা মিলল চলচ্চিত্রের বরেণ্য অভিনয়শিল্পী সুচন্দা ও তাঁর ছোট বোন চম্পার। অপেক্ষারত ছিলেন দীর্ঘদিনের সহকর্মী ইলিয়াস কাঞ্চনের জন্য। এরই মাঝে উপস্থিত হলেন পরিচালক গাজী মাহবুবও। তবে তখনও ঘুমে আছেন কাঞ্চন — মাগরিবের নামাজ শেষে তিনি বিশ্রামে চলে গিয়েছিলেন। প্রায় রাত নয়টার দিকে তাঁর ছেলে জয় তাঁকে শোবার ঘর থেকে বসার ঘরে নিয়ে আসেন। সামনে সুচন্দা ও চম্পাকে দেখে মুহূর্তেই যেন চমকে ওঠেন কাঞ্চন, মুখে ফুটে ওঠে হাসি। দীর্ঘ অসুস্থতার ক্লান্তি ভুলে প্রিয়জনদের পাশে পেয়ে তাঁর চোখে দেখা যায় আবেগের ছাপ।

শুরুতেই ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয় তাঁকে। কে এসেছেন জানতে চাইলে হাসিমুখে দুই বোনের দিকে তাকান তিনি — যেন নাম বলার প্রয়োজনই নেই, এই মুখ দুটি তাঁর কাছে অতি পরিচিত। কথোপকথনের একপর্যায়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন চম্পা, জানান, 'আমরা আপনাকে ভালোবাসি।' জবাবে কাঞ্চন বলেন, 'আমিও ভালোবাসি সবাইকে। খুব ভালো লাগছে।' চম্পা আবার জিজ্ঞেস করেন, 'কতটা ভালোবাসেন?' তখন দুই হাত প্রসারিত করে কাঞ্চন বলেন, 'এতটা ভালোবাসি।' মুহূর্তেই সেখানে উপস্থিত সবাই হেসে ওঠেন। দীর্ঘ চিকিৎসা আর অনিশ্চয়তার দিনগুলো যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য দূরে সরে যায়।

এরপর দুই বোনকে পাশে বসিয়ে পুরোনো দিনের আড্ডায় মেতে ওঠেন ইলিয়াস কাঞ্চন। কথার ফাঁকে ফাঁকে উঠে আসে তাঁর কর্মময় জীবনের নানা স্মৃতি। বিশেষ করে সুচন্দা প্রযোজিত 'তিনকন্যা' ছবির প্রসঙ্গ — যে ছবিতে অভিনয় করেছিলেন কাঞ্চন। সিনেমার সেসব দিন যেন কথায়, হাসিতে ও স্মৃতিচারণায় আবারও ফিরে আসে। একপর্যায়ে দুই বোনের অনুরোধে গান ধরেন তিনি। প্রথমেই 'অচেনা' ছবির জনপ্রিয় গান 'আর যাব না আমেরিকা' পরিবেশন করেন। গান গাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে ঠোঁট মেলান সুচন্দা ও চম্পা। এরপর আরও কয়েকটি গান শোনান তিনি, আড্ডা জমে ওঠে হাসি-আনন্দে।

একটু পর একে একে সেখানে পৌঁছান চলচ্চিত্র অঙ্গনের আরও অনেকে — অভিনয়শিল্পী সুব্রত, জ্যাকি আলমগীর, প্রযোজক নেতা খোরশেদ আলম। চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির পক্ষ থেকে আসেন জয় চৌধুরী ও আবীর চৌধুরী। চম্পা সঙ্গে করে আনা জমজমের পানি নিজ হাতে কাঞ্চনকে পান করান। উপহারের কয়েকটি পাঞ্জাবিও তুলে দেন তাঁর হাতে। চম্পার অনুরোধ, পাঞ্জাবিগুলো এবার লন্ডনে যাওয়ার সময় সঙ্গে নিয়ে যেন সেখানে গিয়ে পরেন।

কথা, হাসি আর স্মৃতিচারণায় কখন যে রাত সাড়ে দশটা বেজে গেছে তা টেরই পাওয়া যায়নি। তবে এবার বিদায়ের পালা। সুচন্দা ও চম্পাকে ফিরে যেতে হবে নিজ বাসায়, আর ইলিয়াস কাঞ্চনেরও ঘুমের সময়। ছেলে জয় জানান, এখনও এশার নামাজ পড়া হয়নি তাঁর — নামাজ পড়েই ঘুমিয়ে পড়বেন। লিফটে নামতে নামতে সুচন্দা জানান, 'চমৎকার একটা আড্ডা হলো। আমাদের যেমন বেশ ভালো লাগল, কাঞ্চন সাহেবও বেশ উপভোগ করেছেন। অনেক হাসি আর আড্ডা করল। মনে হচ্ছে, আল্লাহ তাঁকে দ্রুত সুস্থ করে তুলবেন।' বড় বোনের কথায় সায় দেন চম্পাও। এরপর গাড়িতে উঠে চলে যান তাঁরা।

উল্লেখ্য, ১৫ মাসেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাজ্যে চিকিৎসা শেষে গত ৩ আগস্ট দেশে ফিরেছেন জনপ্রিয় এই চিত্রনায়ক ও 'নিরাপদ সড়ক চাই' (নিসচা)-এর চেয়ারম্যান। ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হওয়ার পর গত বছরের এপ্রিল থেকে লন্ডনে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। গত বছরের আগস্টে লন্ডনের একটি হাসপাতালে তাঁর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়। টিউমারের বড় একটি অংশ অপসারণ করা গেলেও ঝুঁকির কারণে পুরো টিউমার সরানো সম্ভব হয়নি, পরে চিকিৎসকেরা তাঁকে ব্রেন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানান। প্রথম ধাপে টানা তিন মাস কেমোথেরাপি ও ওরাল থেরাপি চলে। পারিবারিক সূত্র অনুযায়ী, ১২ সপ্তাহে ৬০টির বেশি কেমোথেরাপি নিতে হয়েছিল তাঁকে। এরপর আরও দুই ধাপে মোট প্রায় একশটি কেমোথেরাপি নেন এই অভিনেতা। দেশে ফেরার পর থেকে সহকর্মীদের ভালোবাসায় সিক্ত হচ্ছেন তিনি। আগেই আলমগীর, রোজিনা, আনোয়ারা, মুক্তি, লামিয়া চৌধুরীসহ অনেকে তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন। তবে শনিবার রাতের এই আড্ডা ছিল ব্যতিক্রম — দীর্ঘ অসুস্থতার অন্ধকার পেরিয়ে কাঞ্চনের মুখে ছিল হাসি, কণ্ঠে গান, আর চারপাশে দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা।